আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
জাতীয়স্লাইড

ভাষাকে বাঁচান

ফরিদা হাফিজ : ‘ব’ য়ে ‘রস্বি’ ড য়েসিন ন ‘ড়’ ‘আকার’ ‘ল’- মেকুর, কিংবা ‘ড’ য়ে ‘র¯ি’^ ‘ম’- বয়দা, অথবা ‘ফ’ ‘রস্বু’ ‘প’ য়ে ‘আকার’- হুক্কা- এগুলো হচ্ছে কয়েকটি শব্দের বানান আর তার আঞ্চলিক উচ্চারিত শব্দ বিড়াল, ডিম ও ফুপা। আমাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু আমরা যখন কথা বলি তা আঞ্চলিক নয়, বরঞ্চ একটি সাধারণ মান ভাষা যা যোগযোগের প্রয়োজনে ব্যবহার হয়ে থাকে। ভাষা হচ্ছে মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম যার দ্বারা মানুষ যোগযোগ স্থাপন করে থাকে। পৃথিবীর একেকটি অঞ্চলের ভাষা যেমন একেক রকম, তেমনি একটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের ভাষাও ভিন্ন। প্রতিটি দেশে কাজের সুবিধার্থে সুষম যোগযোগের স্বার্থে একটি মান ভাষা বা সেটি যেমনই হোক না কেন ব্যবহার করা হয় যে ভাষায় সব অঞ্চলের মানুষ কথা বলতে পারে। এতে একটি সহজ, সরল ও সকলের বোধগম্য বিশেষ ভাষা ব্যবহার করা হয়ে থাকে, সেটিই মান ভাষা যা আনুষ্ঠানিক ও ব্যবহারিক বা ব্যবহারযোগ্য। একটি কক্ষে একজন চট্টগ্রামের, একজন সিলেট এবং একজন ময়মনসিংহের তিনজন অচেনা মানুষ অবস্থান করলে তারা যদি যার যার নিজের অঞ্চলের ভাষায় কথা বলে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে চান, তাহলে একটি জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হবে তা সহজেই অনুমেয়। এতে কেউ কাউকেই বুঝতে, অনুধাবন করতে পারবেন না। কিন্তু তারা যদি একটি এমন ভাষা অনুসরণ করেন যা সকলেই জানেন এবং বোঝেন, তবে তাদের আলাপচারিতায় বোঝাপড়া ঠিকভাবে বা ভালোভাবে হবে। এই প্রয়োজন থেকেই মান-ভাষার প্রয়োজন থেকেই যায়, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। নিজের দেশ ছেড়ে পৃথিবীর অন্য যে কোনো প্রান্তে বা বিদেশে গেলে মানুষ যেমন একটি সাধারণ ভাষা যা সকলে জানে, যেমন ইংরেজি ব্যবহার করে, তেমনি নিজের দেশের ভেতরের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা থাকা সত্তে¡ও যোগাযোগের সুবিধার্থে মানুষ সকলের বোধগম্য একটি বিশেষ ভাষা ব্যবহার করে থাকে, এতে করে কাজের সুবিধা হয়, কোনোভাবেই আঞ্চলিক ভাষার মান কমে না, বরঞ্চ ভুল উচ্চারণে দুষ্ট হওয়ার আশংকা থেকে মুক্ত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রয়েছে ভাষার বিভিন্নতা। বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার বৈচিত্র্য নিজস্ব সৌন্দর্যে ও উৎকর্ষে অতুলনীয়। মনে রাখতে হবে বাংলা ভাষা পৃথিবীর সমৃদ্ধ ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম। একে বিকৃত করে জাতির সভ্যতার স্মারক নষ্ট করা একটি অপরাধ। সঠিকভাবে শুদ্ধ শব্দ বলতে ও লিখতে না পারা আমাদের ভাষা শিক্ষার অনীহাকে তুলে ধরে। বিপরীতে বিদেশী ও বিকৃত শব্দ-বাক্য প্রয়োগে কথা বলার চেষ্টা আসলে হীনমন্যতার পরিচায়ক। শুদ্ধ বাংলায় কথা বলার অর্থ এই নয় যে আঞ্চলিক ভাষাকে ছোট করা, বরং আঞ্চলিক ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই সঠিক উচ্চারণে কথা বলাটাই কাম্য, এতে ভাষার বিকৃতি রোধ করা সম্ভব।
শব্দ জোড়া দিয়ে বাক্য। বাক্যময় ভাষা। ভাষার মধ্য দিয়ে আমাদের অশ্রæপাত, আমাদের রক্তপাত। ভাষার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় সমাজ ভাষ্য, স্মৃতি-সত্তা ইতিহাস।
ভাষা বহন করে স্বপ্ন সংগ্রাম ও যাপনপ্রণালী। যাপনে নিহিত থাকে সংস্কৃতির চিহ্ন। যাপন প্রণালী নিহিতার্থ খুঁজে সংস্কৃতির পরিসরে। সংস্কৃতির প্রধান উপাদান ভাষা।
শব্দ উঠে আসে সমাজ থেকে। সমাজ থেকে শব্দ জুড়ে বসে গঠন করে যে ভাষা-স্রোত তাতে সমাজের ছাপ থাকে আবার সেই ভাষাও ছাপ রাখে সমাজে।
কথায় কথায় একটি ভাষার মধ্যে অন্য ভাষার, বেশি বেশি বিদেশী শব্দ, বিকৃত ধ্বনি বা শব্দ, আপত্তিকর শব্দ, নানা রকম শব্দহীন ইঙ্গিতবহ ভাষা প্রয়োগ, এগুলো মানুষের প্রকৃত শব্দ-ভন্ডারকে ক্রমে মুছে দিতে থাকে। ব্যবহারের অভাবে সময়ে সেই শব্দ, সেই ভাষা হারিয়ে যেতে থাকে। এটা ঠিক যে প্রতিটি ভাষার প্রাণ আছে, গতি আছে, সময়ের আবর্তনে প্রচুর শব্দ চলমান ভাষায় ঢুকে পড়ে মূল ভাষার সাথে মিশে যায় সময়েরই প্রয়োজনে, ভাষার বিবর্তন ঘটে। তবে শুধুমাত্র সঠিক ভাষা ও শব্দটি না জানার কারণে হালের চমক চলতি শব্দ প্রয়োগে কথা বললে তাতে ভাষার মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়। ঢালাওভাবে এরকম চলতে থাকলে ভাষা দূষিত হয়ে পড়ে এবং সংক্রমিত হয়ে তা ব্যাপক রূপ ধারণ করে- যেভাবে কালব্যাধির সংক্রমণ হয়, এটাও ঠিক তেমন। ভাষার সংক্রমণ ঘটানোর চেয়ে সচেতনভাবে ভাষা ব্যবহার বেশী জরুরি।
প্রকৃত ভাষা শিক্ষার অভাবে- মানুষ আঞ্চলিকতার প্রভাবমুক্ত হতে পারে না, উপরন্তু বিদেশী ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার ভাষাকে জীর্ণ করে তোলে। আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের আধিক্য, একটি মান ভাষা সঠিকভাবে রপ্ত না হয়ে ওঠায় এবং শিখতে অনিচ্ছুক হওয়াতে ভাষা আঞ্চলিকতায় দুষ্ট হয়, ক্রমে তা ব্যাপ্ত ও বিস্তৃত হয়ে ভাষার মূল কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলে, ক্রমে মূল ভাষার স্থান দখল করে নেয় আগন্তুক শব্দসমূহ। এভাবে ভাষার দূষণ ও বিকৃতি ঘটে থাকে।
শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার অভাব- স্কুল-কলেজসহ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে আমাদের দেশ, কৃষ্টি, সভ্যতা-সংস্কৃতি অবহেলিত, ভাষা চর্চার সুযোগ নেই বললেই চলে। উল্টো বিদেশী সংস্কৃতির চর্চা প্রবল। সুতরাং শিক্ষার্থীদের জানার ও শেখার দরজা বন্ধ, ফলে ভাষাটা সঠিকভাবে ও শুদ্ধভাবে শেখা হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে শিশুরা প্রথম শেখে স্কুল থেকে, স্কুলের শিক্ষা শিশুর জীবনে গাঢ় ছাপ ফেলে থাকে। শিশুর বাবা-মা ও প্রথম শিক্ষক শিশুর জীবনের আদর্শ, তারা নিজেদের প্রিয় সব চরিত্রকে নিজের মধ্যে প্রতিস্থাপিত করে, নিজেদের প্রিয় ব্যক্তিদের ছাচে ঢেলে নিজেকে সেই ব্যক্তি হিসেবে ভাবতে ভালবাসে এবং অনুকরণ করে থাকে। সুতরাং স্কুল শিশুর জন্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা যেখান থেকে তার ‘ঠিক’ বা ‘ভুল’ শিক্ষার উন্মেষ। তাই ভাষার ব্যাপারে এখানেই সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেওয়া এবং সাবধান হওয়া প্রয়োজন।
দেশপ্রেমের অভাব- দেশপ্রেমের অভাব ভাষা না জানার একটি বড় কারণ। দেশের প্রতি ভালবাসা না থাকার কারণে মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে চটকদার অপসংস্কৃতিকে আপন করে নিয়ে আমাদের দেশ ও স্বাধীনতার চেতনাকে অপমান করছে উল্টে জায়গা দখল করে নিচ্ছে বিদেশী সংস্কৃতি, পণ্যসহ অনাকাক্সিক্ষত আরো অনেক কিছু।
ভাষার কাঠামো ভেঙে পড়েছে- ভাষার চর্চার অভাবে এবং এর অপব্যবহারের ফলে আমাদের ভাষার কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
উপস্থাপনার বর্তমান ধরন- বিভিন্ন গণমাধ্যম (রেডিও, টেলিভিশন, ইউটিউবসহ ইন্টারনেট)
কখনও কখনও আমাদের গনমাধ্যমগুলোও উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। কোনো কোনো বেতার উপস্থাপকেরা ইংরেজী ও বাংলার মিশ্রণে অদ্ভুত এক বিকৃত ভাষা মাধ্যম ব্যবহার করছেন যা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এবং তারা সেটির অন্ধ অনুকরণ করছে। এ ক্ষেত্রে তরুণ সমাজের মাধ্যমে এই বিকৃতি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।
আরজে-র আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে রেডিও জকি। বেতার বা রেডিওর বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে থাকেন আরজে-রা। অধুনা এই জাতীয় উপস্থাপনে খুবই নতুন ধরনের অস্বাভাবিক একটি ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে যাকে বাংরেজী বললে অত্যুক্তি হবে না। এটি এক ধরনের বিকৃতি।
ডিজে- আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ডিস্ক জকি। বিভিন্ন সামাজিক কিংবা কর্মক্ষেত্রে উৎসব অনুষ্ঠানে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশেষ করে সঙ্গীতে যে সব ছেলে বা মেয়ে গান করে থাকেন, তারাই ডিজে। বিদেশী ঢংয়ে নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশন আজকাল বেশ জনপ্রিয়। এখানেও দেশী সংস্কৃতিকে মুছে দেয়ার মূর্খ প্রয়াস চলে থাকে।
বর্তমানে রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেটে তুলে দেয়া বিভিন্ন ছোট বড় অনুষ্ঠানে যারা উপস্থাপনা করেন বা বক্তব্য রাখেন, তাতে উচ্চারিত বাংলাভাষা বিকৃতভাবে উচ্চারিত হয় থাকে। একটি বিশেষ উচ্চারণ ভঙ্গি যা না-বাংলা না-ইংরেজী, ইংরেজী বাংলার সংমিশ্রণে অ™ভুত এক ভাষা, যাকে বিদ্রƒপ করে বাংরেজী বা বাংলিশ নাম দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন নাটকেও ভাষার ভয়াবহ দূষণ ঘটছে। একটি নাটকে চরিত্রের মুখে আঞ্চলিক ভাষায় সংলাপ বসানো হলো, যখন একের অধিক চরিত্র কথা বলে তখন দেখা যায় একেকটি চরিত্র একেক অঞ্চলের ভাষায় কথা বলছে। আবার একই চরিত্র একটি বিশেষ অঞ্চলের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে সেখানে অন্য অঞ্চলের শব্দও বলছে। যেমন, ধরা যাক চরিত্র যশোহরের ভাষায় কথা বলছে, বলতে বলতে সে একবার ময়মনসিংহ তো একবার এমনকি সিলেটের আঞ্চলিক ভাষারও সংমিশ্রণ ঘটিয়ে চলেছে নিজের অজান্তে। এমনটি হচ্ছে কারণ সে কোনো একটি অঞ্চলের নির্দিষ্ট ভাষাটিকে সঠিকভাবে শিখে নেয়নি, কারণ ভাষা শিক্ষা বিষয়টি তার অথবা কারোর কাছেই তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে ভুল উচ্চারণে আর সংমিশ্রণের কারণে ভয়বহ ভাষা-দূষণ ঘটছে। প্রচার মাধ্যম মানুষকে প্রভাবিত করে সবচেয়ে বেশী। ফলে এই ভয়াবহ দূষণ ব্যাপকভাবে প্রচার এবং প্রসার পাচ্ছে, এটা সংক্রমণের মত, মানুষ এখন ভাষা দূষণের সংক্রমণে আক্রান্ত।
বাস্তবতা বা ভয়াবহতার কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এই দূষণ এতই ভয়াবহ যে এর থেকে নিরাময় সহজ নয়। যেহেতু এই ‘ভুল’ বিষয়টিকে ভুল বলে মানুষ চিহ্নিত করতে পারেনি, অর্থাৎ এই ‘ভুল’ ই ‘ঠিক’ হিসেবে পরিচিত, সেহেতু এই সংক্রমণ সম্পর্কেও মানুষের কোনো ধারণা নেই। কঠিন ব্যাধি যেভাবে অজান্তে মানুষের শরীরের ভেতরটা শেষ করে দিতে পারে ঠিক সেভাবেই ভাষা-সংক্রমণে আক্রান্ত এমনকি ভাষার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, আগামী প্রজন্ম অদূর ভবিষ্যতে আর জানতেও পারবে না সঠিক ভাষাটা কি ছিল, কেমন ছিল।
সমাধান প্রস্তাবনা- পরিবারে, স্কুলে-কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে- সকল ক্ষেত্রে নিজ ভাষা, বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে বলা ও লেখা, সঠিকভাবে শব্দ উচ্চারণসহ সঠিকভাবে ভাষা চর্চা কোনো বিকল্প নেই। নিজ বাড়িতে অভিভাবকরা সন্তানকে ভাষা শিক্ষা দেবেন, তারও আগে তাদের নিজেদেরও ভাষা ও তার প্রয়োগে যথেষ্ট সচেতন হতে হবে। এই সুযোগে প্রয়োজনে বাবা-মা নিজেরাও তাদের ভুল সংশোধন করে নিতে পারেন এই মনে করে যে, শেখার কোনো বয়স থাকে না, আর ভাষার ব্যাপারটা একটু সচেতন হলেই আয়ত্ত করে ফেলা যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক শিক্ষিকারা তাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করলে শিশুরা ঠিকটাই শিখবে এবং যদি তারা ভাষাটা ভালভাবে না জেনে থাকেন, জেনে নেবেন, কাজটা তেমন কঠিন হবে না, নিজের মাতৃভাষা বৈ তো নয়! রইলো বাকী কর্মক্ষেত্র। প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলার জন্যে অনুরোধ করা যেতে পারে যাতে ভাষার যতœটা হয়। দেশপ্রেম থাকলে সবকিছুই সম্ভব, প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, তাহলেই আমাদের ভাষা সম্ভাব্য মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে আসতে পারে। দেশকে ভালোবাসলে সবাই মিলে হাতে হাত ধরে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা যাবে এমনটাই আশা করা যায়। বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষিতে একটি সময়োপযোগী ভাষা-রীতি প্রণয়নের ওপর জোর দেয়া যেতে পারে।
মন্তব্য
বাংলাভাষার-দূষণ হচ্ছে
ড. মো: গোলাম রহমান
প্রধান তথ্য কমিশনার
সাক্ষাৎকার : জিন্নাতুন নূর
বাংলা আমাদের গৌরবের ভাষা, অস্তিত্বের বড় নিদর্শন। বিশ্বে এমন খুব কম জাতি আছে যারা ভাষা রক্ষা করার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন শুধুমাত্র আমাদের জন্য ইতিহাস নয়, এটি আমাদের ঐহিত্য ও সংস্কৃতিরও অংশ। সকল ভাষাই বিকাশমান এবং পরিবর্তনশীল। সমাজ প্রগতির সঙ্গে এর পরিবর্তনও ঘটে। আমাদের বাংলাও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষার সংস্পর্শে এসে কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে কিছু পরিবর্তন আসলেও বাংলার আদি রূপ ও ঐতিহ্য টিকে থাকবে।
আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে এখন গণমাধ্যমে বিশেষ করে বিভিন্ন এফ এম রেডিওতে বাংলার যে সাধারণ রূপ সেটি রক্ষা না করে এই ভাষাকে আরোপিত করা হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে এক ধরনের ভাষার দূষণ হচ্ছে। আর এই দূষন যে শুধু অন্য ভাষা থেকে আসছে তাও না। এটি হচ্ছে আরোপিত দূষণ। বিভিন্ন ইংরেজি শব্দ ও অকথ্য ভাষা, বাংলা ভাষায় এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে যে, বাংলা ভাষাকে স্বাভাবিক মানসম্মতভাবে রক্ষা করা যাচ্ছে না। একইভাবে আজকাল টেলিভিশনে প্রচুর নাটক ও সিরিয়াল দেখানো হচ্ছে। যেখানে আঞ্চলিক ভাষার প্রচুর প্রয়োগ হচ্ছে। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার থাকবেই এটা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু যখন আমরা দেখি যে, মূল শ্রোতধারার ভাষায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপভাষাকে এত বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে যে সেখানে সাধারণ মানসম্মত বাংলার ব্যবহার অক্ষুন্ন থাকছে না। আগে টেলিভিশন নাটকে দুই-একটি চরিত্র থাকত যেখানে হাস্যরসের প্রণোদনা দেওয়ার জন্য আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার হত। কিন্তু এখন আর তা থাকছে না। এখন জোর করে দর্শককে হাসানোর প্রচেষ্টা হিসেবে ভাষার যে অপব্যবহার হচ্ছে তাতে আমাদের বাংলা ভাষার নিজস্ব সক্রিয়তা ও ঐতিহ্য রক্ষা করা যাচ্ছে না। আমি মনে করি এজন্য কতিপয় মানুষ দায়ী।
অপভাষা ও আঞ্চলিক ভাষা এগুলো থাকবেই, এগুলো রোধ করা যাবে না বরং প্রাকৃতিকভাবেই এগুলো মূল ভাষার মধ্যে চলে আসবে। এই ভাষাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে মূল ভাষার সঙ্গে টিকে থাকবে এবং মূল ভাষাকে তা সমৃদ্ধও করবে। কিন্তু যখন জোর করে কোন ভাষার উপর অন্য কিছু আরোপ করা হবে তখন সেই ভাষাটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেটি আর সমৃদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে সংশিষ্ট সেই ভাষাকে দূষণও করা হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে সেই ভাষাকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের আছে।
বাংলা হচ্ছে বিশ্বে ব্যবহƒত ভাষাগুলোর মধ্যে ৫ম বৃহত্তম ভাষা। সে হিসেবে বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীরা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ একটি গোষ্ঠী। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও উড়িষ্যার কিছু লোক বাংলায় কথা বলেন। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর এই ভাষাকে আন্তর্জাতিকভাবে যে মর্যাদা দেওয়া উচিৎ এবং জাতিসংঘের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আমাদের বড় ধরনের দাবি আছে সেখানে মানসম্মত বাংলা ভাষার চর্চা যদি আমরা অব্যাহত রাখতে পারি তা যেখানেই হোক-কাজেকর্মে অথবা গণমাধ্যমে তাহলে তা জাতিসংঘের ভাষা হিসেবে দ্রæত স্বীকৃতি পেয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close