আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
খেলাধুলা

ক্রীড়াঙ্গনে অদম্য নারীদের গল্প

শামসুজ্জামান শামস : আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের মেয়েরা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেই চলছে। ভারোত্তোলন, সাতার, টেবিল টেনিস, দাবা, শুটিং, ফুটবল এবং ক্রিকেটে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা ক্রীড়াবিশ্বে দাপটের সঙ্গে লড়াই করে জাতির জন্য সুনাম বয়ে আসছে। প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসেবে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে নাম লিখিয়েছিলেন টেবিল টেনিস খেলোয়াড় জোবেরা রহমান লিনু। দাবা অঙ্গনে রানী হামি দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। শুটিংয়ে বাংলাদেশকে একাধিক স্বর্ণপদক এনে দিয়েছেন সাবরিনা সুলতানা । দ্বাদশ দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে (এসএ গেমস) বাংলাদেশ দল চারটি স্বর্ণ পদক জিতেছে। এই চার স্বর্ণের তিনটিই জয় করেছেন ভারোত্তোলক মাবিয়া আকতার সীমান্ত এবং সাতারু মাহফুজা খাতুন শিলা। জাহানারা আলম দাপটের সঙ্গে মেয়েদের ক্রিকেট বিশ্ব মাতিয়ে বেড়াচ্ছেন। বাংলাদেশের মেয়ে ফুটবলার সাবিনা খাতুন মালদ্বীপে খেলে এসেছেন। সার্ফিংয়ে নাসিমা আক্তার এবং কুস্তিতে শিরিন সুলতানা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
রানী হামিদ : ১৯৮৮ সালে আন্তর্জাতিক মাস্টার (আইএম) খেতাব অর্জন করেছেন রানী হামিদ। তার পর এই ২০১৬ সালে এসেও মেয়েদের দাবায় প্রতিষ্ঠিত নাম খুঁজতে গেলে ঘুরে ফিরে আসবে তারই নাম।
সংসার-সন্তান সামলে স্বামীর প্রেরণায় ৩৩ বছর বয়সে দাবা আঙ্গিনায় পদার্পণ করেন রানী হামিদ। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি বছর। রানী হামিদের বয়স এখন ৭২। এখনও তার দাবা-প্রেম অটুট-অক্ষয়। রানী হামিদ ১৯৮৩,৮৫ এবং ৮৯ সালে ব্রিটিশ ওমেন চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছেন। নাতনি বয়সী তানির সঙ্গে খেলে এখনও সমান আনন্দ পান। তিনি খেলেনই যে আনন্দ পাওয়ার জন্য। ‘আনন্দ পাই দাবা খেলে, তাই খেলি। সামনে যে-ই থাকুক, সে প্রতিপক্ষই, ছোট-বড় দিয়ে কিছু যায়-আসে না। আর ছোটদের কথা বলছেন? এখনকার ছোটরা অনেক বেশি স্ট্রং’, বলেছিলেন দাবার রানী। তার খুব ইচ্ছা ছিল, সন্তানরা তার সঙ্গে দাবার বোর্ডে বসবে। সেটিা হয়নি। বড় ছেলে কায়সার হামিদ একসময় ঢাকার মাঠ মাতানো ফুটবলার ছিলেন। কায়সার হামিদ জানান, ‘আসলে সে সময়ে আমাদের ঝোঁক ছিল আউটডোর গেমসের প্রতি বেশি। তাই দাবা আমাদের টানেনি।’ তবে রতœগর্ভা মায়ের এমন অভ‚তপূর্ব কীর্তি সন্তান হিসেবে তাকে আপ্লুত ও গর্বিত করেছে। মোহামেডান ও জাতীয় দলের সাবেক এই ডিফেন্ডার বলেন, ‘আমার মা ১৮ বার জাতীয় মহিলা দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বলে অবশ্যই আমি খুশি। তবে এ দেশের যে কোন সাধারণ নাগরিক যে কোন খেলায় জিতলেও আমি সমান আনন্দিত হই।’ সন্তান থেকে আবার মায়ের দিকে যাই। নাতি-নাতনিদের পড়ার এত চাপ যে তারাও দাবার বোর্ডে তার সঙ্গী হওয়ার ফুরসত পায় না। দাবা অন্তঃপ্রাণ রানী হামিদের তাতে অবশ্য খেলার প্রতি আগ্রহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। শুধু কি খেলেই দায়িত্ব সারেন? আলবৎ নয়। মেয়েদের উৎসাহ দিতে নিয়মিত আয়োজন করেন দ্বিতীয় বিভাগ দাবা লীগের। নতুন প্রজšে§র জন্য বই লিখেছেনÑ ‘মজার খেলা দাবা’।
জোবেরা রহমান লিনু : লিনুকে টেবিল টেনিসের রাণী বললে এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলা হবে না। কারণ ১৯৭৪ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশীপ শুরু হওয়ার পর থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ২৮ বারের মধ্যে ১৬ বারই লিনুুর রাজত্ব। এছাড়াও তিনি তিনবার বাংলাদেশ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। যেগুলো জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিবেচিত হলেও গিনেচ রেকর্ডের বেলায় বিবেচনায় আনা হয়নি। সেই ছোট বেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি লিনুুর ছিল দুনির্বার আকর্ষণ। ১৯৬৫ সালের ৯ জুন চট্টগ্রামের কাপ্তাইতে জোবেরা রহমান লিনু জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ আবদুর রহমান। মায়ের নাম আখি রহমান । বাবা ছিলেন সরকারি ইঞ্জিনিয়ার আর তাই খুলনাবাসী আব্দুর রহমানকে ঘুরতে হতো সারা বাংলাদেশেই।
সিলেটে থাকাকালীন সময় শাহজিবাজার অফিসার্স ক্লাবে বড় বোনের সঙ্গে খেলতে যান লিনু এবং টেবিল টেনিস খেলাটাকে ভালোবেসে ফেলেন। ৯ বছরের ছোট্ট লিনুকে তার বাবা শিখিয়ে দিতেন খেলার সব আধুনিক পদ্ধতি। দুপুরে খাওয়ার পর বিকেল বেলাটা তারা ডাইনিং টেবিলকে টেনিস কোর্ট তৈরি করে অনুশীলন করতেন। লিনু যখন মাত্র ৯ বছর বয়সে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশীপে অংশগ্রহণ করেন তখন অনেকেই অবাক হয়েছিলেন তাকে দেখে। কারণ তার উচ্চতা আর টেবিলের উচ্চতা ছিল প্রায় সমান। অথচ সবাইকে অবাক করে দিয়ে ছোট্ট লিনু সেই টুনার্মেন্টের ফাইনাল খেলারযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। ফাইনালে আর পারেন নি। ফাইনালে তিনি হেরে যান বড় বোন হেলেনের কাছে। ১৯৭৭ সালেই জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেন বড় বোন হেলেনকে হারিয়েই। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২। সেই শুরু। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। শুধুই এগিয়ে চলার পালা। ক্রমাগত সাফল্য লিনুকে আজকের এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। তার অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাড়াতে পারে নি কেউ। তবে মাঝে দু’একবার চ্যাম্পিয়নশীপ হাতছাড়া হয়েছে। তবে তা বেশিদিন হস্তগত রাখতে পারে নি কেউ। অচিরেই তা পুনরুদ্ধার করেছেন প্রবল বিক্রমে।
সাবরিনা সুলতানা : মেয়েদের শুটিংয়ে বাংলাদেশে উজ্জ্বল নক্ষত্র বরা যায় তাকে। সর্বশেষ বাংলাদেশ গেমসে স্বর্ণ জিতে অবসরের সিদ্ধান্ত নেন সাবরিনা সুলতানা। তিনি জন্মগতভাবেই শুটার হয়ে বেড়ে উঠেছেন। চিকিৎসক বাবা মোসলেম উদ্দিন ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রেপলিটন শুটিং ক্লাবের শুটার। বাবাকে রাইফেল হাতে দেখে দেখে তার শৈশব কেটেছে। ১৯৮৫ সালে অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় শুটিংয়ে হাতেখড়ি সাবরিনার। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ গেমসের মাধ্যমে সাবরিনার প্রতিযোগিতামূলক খেলায় যাত্রা শুরু। ২১ বছর ধরে চলা সেই অধ্যায়ের ইতি হলো আবারও বাংলাদেশ গেমসে। ১৯৯৩ সালের ঢাকা সাফ গেমসেও অব্যাহত থাকে সাবরিনার সাফল্যের ধারা। প্রোন ইভেন্টে দলগত স্বর্ণ ছিল সাবরিনার প্রথম আন্তর্জাতিক পদক। ১৯৯৬ সালের বাংলাদেশ গেমসে প্রোন ও থ্রি পজিশনে স্বর্ণ জিতলেও প্রিয় ইভেন্ট এবার রাইফেলে রুপা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরুর পাঁচ বছরের মাথায় সেরা সাফল্যটি লাভ করেন তিনি। ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়া কমনওয়েলথ গেমসে আলোকিত করেন সাবরিনা। ১৯৯৯ সালে নেপাল সাফ গেমসে দলগত স্বর্ণ পেলেও ব্যক্তিগত রুপা নিয়ে আবারও সন্তুষ্ট থাকতে হয়। পরের বছর পাকিস্তান সাফ শুটিংয়ে এয়ার রাইফেলের স্বর্ণ আবারও জেতেন সাবরিনা। ১১ বছর আগে ৭ম বাংলাদেশ গেমসে তিনটি ইভেন্টেই সোনার দেখা পান তিনি। অবসরের আগ পর্যন্ত সাফ গেমস ও সাফ শুটিং মিলিয়ে সাবরিনার ঝুলিতে জমা পড়েছে ৮টি স্বর্ণপদক। বাংলাদেশ গেমসে সবাইকে টেক্কা দিয়েছেন শুটার সাবরিনা সুলতানা। ৫০ মিটার থ্রি রাইফেল পজিশন ও ৫০ মিটার রাইফেল প্রোনে স্বর্ণ জিতে বিদায়বেলাকে আরও রাঙিয়েছেন ঢাকা রাইফেল ক্লাবের এ শুটার। ঢাকা রাইফেল ক্লাবের হয়ে ৫৭০ স্কোর গড়ে স্বর্ণ জয় করেন কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণজয়ী এই শুটার। সাফল্যের কারণেই বিদায় বেলায় সতীর্থ, ফেডারেশন কর্মকর্তাদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন স্বর্ণকন্যা সাবরিনা। ২১ বছরের শুটিং ক্যারিয়ারের ইতি টেনে এখন কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত।
মাহফুজা খাতুন শিলা : ২০১৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে সাঁতারে দুইটি স্বণ জিতেন মাহফুজা খাতুন শিলা। নানা সংগ্রাম পেরিয়ে বেড়ে ওঠা শিলার জীবনও বদলে যায় গেমসের পর থেকে। শিলা তখন যশোরের নওয়াপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির আয়োজনে থানা পর্যায়ে খেলাধুলা হচ্ছে। অ্যাথলেটিকসে নাম দেয়া আছে। কিন্তু স্কুলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আথলেটিকসের পর্ব শেষ। তখন হেড স্যার তাকে হাত ধরে নিয়ে যান সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। সেই প্রতিযোগিতায়ও প্রথম। তারপর জেলা পর্যায়ে ডাক। সেখানেও প্রথম। এভাবেই সাঁতারে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
২০০০ সালেই সুইমিংয়ে আসেন মাহফুজা আক্তার শিলা। দু’বছর অবধি নিজ জেলা দলের হয়ে সাতরান নওয়াপাড়ার পাচকবর গ্রামের এই সাঁতারু। ২০০২ সালে সপ্তম বাংলাদেশ গেমসে যশোর সুইমিং ক্লাবের হয়ে জলে নেমে তৃতীয় হন শিলা। ব্যাস, নজরে পড়ে যান বিকেএসপির কর্মকর্তাদের। যার ফলে ভর্তি হন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি)। আর ২০০৩ সালেই পেশাদার সুইমিংয়ের জগতে ঢুকে পড়েন। বিকেএসপিতে ভর্তির পরের বছরই জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জেতেন। ২০১৬ ছিল মাহফুজা খাতুন শিলার জন্য ছিল রেকর্ড ভাঙার বছর। সাউথ এশিয়ান গেমসের (সাফ গেমস) রেকর্ড ভেঙেছিলেন তিনি। এটি ছিল তার জন্য বড় প্রাপ্তি। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে এই জলকন্যা পাঁচটি নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়েন, যার মধ্যে ব্যক্তিগত তিনটি ও রিলেতে দুটি।
মাবিয়া আকতার সীমান্ত: ১২তম এসএ গেমসে লালসবুজের পক্ষে প্রথম স্বর্ণ জয় করেন নারী ভারোত্তোলক মাবিয়া আকতার সীমান্ত। গেমসের তৃতীয় দিনে গৌহাটির ভোগেশ্বরী ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত মেয়েদের ৬৩ কেজি ওজন শ্রেণিতে স্ন্যাচে ৬৭ ও ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ৮২সহ মোট ১৪৪ কেজি উত্তোলন করে প্রথম স্থান অধিকার করেন মাবিয়া। মাদারীপুরের মেয়ে সীমান্তের কারণে এসএ গেমসে প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি— বেজেঁছে। স্বর্ণ জয়ের পর জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় আনন্দে কেঁদে ছিলেন স্বর্ণজয়ী সীমান্ত।
তিন ভাইবোনের মধ্যে সীমান্তর অবস্থান তিন নম্বর। ভাই বড় তার পর মেঝ বোন। সবার ছোট সে। খেলাধুলার পাশাপাশি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে চাকরি করেন সীমান্ত। এতো খেলা থাকতে সীমান্ত ভারোত্তোলক হলেন কেনো? এমন প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। দারিদ্যের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠা মেয়েটির কোনো স্বপ্ন ছিল না। শৈশবে বান্ধবীদের সঙ্গে লুকোচুরি ছিল তার প্রিয় খেলা। গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর হলেও মেয়েটির জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এই তিলোত্তমা ঢাকায়। শহরের মেয়ে হলেও গ্রামীণ খেলাধুলা ছিল তার প্রিয়। দারিয়াবান্ধা, ইচিং বিচিং, সাত চাড়া ইত্যাদি। মাবিয়া আকতার সীমান্তের সামনে অনেক পথ খোলা ছিল। ক্রিকেট, ফুটবলসহ অনেক খেলা থাকার পরও কঠিন এক খেলা বেচে নিয়েছেন। ভারোত্তোলন অন্য আরদশটি খেলার মতো সহজ খেলা নয়। মামা শাহদাত হোসেনের অনুপ্রেরণায় এ খেলাকে বেচে নিয়েছেন তিনি। মামা বক্সিং কোচ হলেও ভাগনিকে কিন্তু বক্সার বানাননি। মামা এবং মামার বন্ধু ফারুক সরকারের অনুপ্রেরনায় ভারোত্তলোনকে বেচে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সীমান্ত। এক স্বর্ন জয় সীমান্তকে রাতারাত্রি তারকা বনে নিয়ে যায় ।
অলিম্পিকে সোনিয়া : ২০১৬ সালে ব্রাাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে লাল-সবুজের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন ঝিনাইদহের মেয়ে সাঁতারু সোনিয়া আক্তার। সোনিয়ার বাবা আনিসুর রহমান বলেছেন, বড় ছেলে সাঁতার শিখতেন জাহিদ স্যারের কাছে। সোনিয়াও বায়না ধরেন সাঁতার শেখার। বায়নার কারণেই সোনিয়াকে কোচের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন তার বড় ভাই। ২০০৩ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ড দলের হয়ে বয়সভিত্তিক সাঁতার দিয়ে সোনিয়ার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ শুরু। জাতীয় পর্যায়ে জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে ২০০৬ সালে জেতেন ১১টি সোনা, দুটি ব্রোঞ্জ। আর ২০১০ সালে ১১টি ইভেন্টে অংশ নিয়ে দশটিতেই জেতেন স্বর্ণ। এর মধ্যে ৯টিতে ছিল জাতীয় রেকর্ড। ঘরোয়া টুর্নামেন্টে এমন সাফল্যই তাকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সোনিয়ার বাড়ি ঝিনাইদহ শহরতলীর ভুটিয়ারগাতিতে। সোনিয়া ওই গ্রামের মাদরাসায় আলিম পড়ছেন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশে আনসারের হয়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার পর সোনিয়া স্থায়ী চাকরি পেয়েছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে। সোনিয়া প্রথম আন্তর্জাতিক মিটে অংশ নেন সিঙ্গাপুরে ২০১০ যুব অলিম্পিক গেমসে, ২০১১-তে যুক্তরাজ্যের আইল অব ম্যানে অংশ নেন কমনওয়েলথ যুব গেমসে। এরপর অংশ নিয়েছেন ২০১৪ কাতার বিশ্ব সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপ ও ২০১৫ কাজান বিশ্ব সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে। মেয়ে সোনিয়াকে নিয়ে প্রায়ই প্রতিবেশীদের তিরস্কার শুনতে হতো বাবা আনিসুরকে। প্রতিবেশিরা বলতো, মেয়ে মানুষ, সাঁতার শিখিয়ে কী হবে। কিন্তু বাবা আনিসুর কখনই মেয়ে সোনিয়াকে বাঁধা দেননি। ফলে সোনিয়া ঝিনাইদহের নবগঙ্গা থেকে শুরু করে মাতিয়েছেন মিরপুরের জাতীয় সুইমিংপুল। ৭টি স্বর্ণ, তিনটি রুপা ও একটি ব্রোঞ্জপদক জিতেছেন। সব মিলিয়ে ১১টি পদক জিতে জাতীয় সাঁতারে সেরা হয়েছেন সোনিয়া আক্তার টুম্পা। যার মধ্যে ছয়টি নতুন জাতীয় রেকর্ডও গড়েছেন ঝিনাইদহের এই সাঁতারু।
নাসিমা আক্তার : সার্ফিং মানে ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ। বড় বড় সব ঢেউকে জয় করে যেই এগিয়ে যেতে পারবে সেই হবে জয়ী। বেঁচে থাকা মানেই সংগ্রাম করা যেনো প্রতিমুহূর্তে আচমকা আসা ঢেউগুলোকে পাড়ি দিয়ে যেতে হবে বহুদূর। আর সার্ফিং খেলাটাই জীবনযাত্রার সাথে মিল সবসময়। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের মেয়ে সার্ফাররা এগিয়ে যাচ্ছেন। নাসিমা কক্সবাজারেরই মেয়ে। সাগর পাড়ে বেড়ে উঠা মেয়েটি সার্ফার হিসেবে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সুনাম বয়ে এনেছেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার নাসিমার সার্ফিং জীবন এবং কক্সবাজারের সার্ফিং নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘নাসিমা’। বিশ্বের বহুল পরিচিত ওয়েবপোর্টাল ইয়াহু ডটকমের বিউটি শাখায় গত ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই নাসিমা আক্তার নামে এক বাংলাদেশি নারী সার্ফারকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল ‘দ্য বাংলাদেশি সার্ফ স্টার ডিফাইয়িং কালচারাল ট্যাব্যুস। এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘বাংলাদেশের সার্ফিং তারকার সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম। এর আগে ২০ জ্লুাই যুক্তরাজ্যের বহুল পরিচিত ম্যাগাজিন ম্যারিক্লেয়ার-এ নাসিমাকে নিয়ে প্রথম একটি লেখা প্রকাশিত হয়।
‘পোস্টার গার্ল’ বা বিজ্ঞাপনের মুখ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। ব্রিটেনভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ ‘বাংলাদেশি সার্ফার গার্ল সিঙ্কস মুসলিম ট্যাব্যুজ’ শিরোনামে বাংলাদেশী এই তরুণীকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে উঠে এসেছে নাসিমা আক্তার নামে সংগ্রামী ওই কিশোরীর অসামান্য গৌরবগাথার গল্প।
জাহানারা আলম : ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্বে দিয়েছিলেন জাহানারা আলম। ১৯৯৩ সালেল ১ এপ্রিল খুলনায় জন্ম গ্রহণকারী এ নারী ক্রিকেটারের ওয়ানডে অভিষেক ঘটে ২০১১ সালের ২৬ নভেম্বর আয়ারল্যান্ড মহিলা ক্রিকেট দলের বিপক্ষে। এরপর ২০১২ সালের ২৮ আগষ্ট টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক ঘটে আয়ার ল্যান্ডের বিপক্ষে। বাংলাদেশ নারী দল ২০১০ সালে চীনের গুয়াংচুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের মহিলা ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় চীন জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে রৌপ্য পদক লাভ করে। সেই টুনামেন্টে জাহানারা আলম দারুণ পারফরমেন্স করে ছিলেন। ডানহাতি মিডিয়া ফাস্ট বোলার এবং ডানহাতি এ ব্যাটসম্যান খেলা শুরুর দুই বছর আগেও জানতেন না ক্রিকেট কীভাবে খেলতে হয়। ক্রিকেটে আগমন সর্ম্পকে তিনি জানান,‘আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। স্কুলে হ্যান্ডবল, ভলিবল খেলতাম। তো একদিন আমাদের স্কুলের সামনে সালাউদ্দিন স্যার আমাকে ডাকলেন। জানালেন বিসিবি মেয়েদের ক্রিকেট দল গঠনের জন্য কাজ শুরু করছে। তিনি আমাকে ক্রিকেট খেলার প্রস্তাব দিলেন। আমিও রাজি হলাম। তবে আমার শিক্ষকের কাছে অনুমতি নেওয়ার বিষয়টি জানালাম। বাড়ি থেকেও বাবা-মা অনুপ্রেরণা দিলেন। এরপর আরও ১০-১৫ জন মেয়ের সঙ্গে শুরু হলো আমার ক্রিকেটে হাতেখড়ি।’ খুলনার মেয়ে জাহানারা আলমের অভিষেক হয়েছিল ব্যাটিং দিয়ে। এরপর এক মাসের মধ্যেই নিজের খেলা দিয়ে বোলার হিসেবে মেলে পরিচিতি। কয়েক মাসের অনুশীলন আর ভালো বোলিং করে নির্বাচকদের নজর কাড়েন জাহানারা।
সাবিনা খাতুন : বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবলার সাবিনা খাতুন প্রথম নারী ফুটবলার হিসেবে মালদ্বীপের উইম্যান চ্যাম্পিয়নশিপে খেলছেন। এক সময়ে বাংলাদেশ ফুটবলের কিংবদন্তী কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন দাপটের সঙ্গে হংকংয়ে প্রফেশনাল ফুটবল লিগের দল ক্যারোনিল হিল এফ সিতে খেলেছেন। আবাহনীর রক্ষণভাগের খেলোয়াড় কিং ব্যাক খ্যাত মোমেন মুন্না ভারতের ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবে খেলেছেন। ২০১৪ সালের ১৪ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল মালদ্বীপে মেয়েদের ‘ক্লাব মহিলা ফুটসাল ফিয়েস্তা টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই টুর্নামেন্টে মালদ্বীপ পুলিশ ক্লাবের হয়ে খেলেছেন সাবিনা খাতুন। সাবিনার ফুটবল নৈপুণ্যে ভর করে পুলিশ ক্লাব সেমিফাইনালের টিকেট পেয়েছিল। ফুটসাল লিগে সাবিনা ৫ ম্যাচে করেছেন ৩৭ গোল। প্রথম ম্যাচে সাবিনা হ্যাটট্রিকসহ করেন ৪ গোল। পরের ম্যাচে করেন ১৬ গোল। তৃতীয় ম্যাচে তার পা থেকে আসে ১০ গোল। আর চতুর্থ ম্যাচে করেন হ্যাটট্রিক। পঞ্চম ম্যাচে করেন ৪ গোল। ৩৭ গোল করে টুর্নামেন্টে সাবিনা সর্বোচ্চ গোলদাতা নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ঢাকার মাঠে প্রতিপক্ষের জালে হালি হালি গোল করার দক্ষতা পরিচয় দেয়া সাবিনা মালদ্বীপেও দিয়েছেন।ঢাকার মাঠে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৪ গোল করার রেকর্ড এ স্ট্রাইকার মালদ্বীপে গিয়ে এক ম্যাচে ১৬ গোল করে ভেঙ্গে দিয়েছেন। সাতক্ষীরার এই ফুটবলার ২০১৪ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত সাফ মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে চার ম্যাচে চার গোল করেছিলেন। চার গোলের দুটি করেছিলেন মালদ্বীপের বিপক্ষে। সেদিন তার আক্রমণাত্বক ফুটবল নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন মালদ্বীপের ফুটবল কোচ ও কর্মকর্তারা। সেই নান্দনিক ফুটবল শৈলীর কল্যাণেই শেষ পর্যন্ত মালদ্বীপ পুলিশ ক্লাব তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। সাবিনার পারিশ্রমিকটা বেশ ভালোই ছিল। পুলিশ ক্লাব তাকে ৮০০ ডলার পারিশ্রমিক দিয়েছে।
শিরিন সুলতানা : বর্তমান বিশ্বে যে কয়টি খেলা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় খেলা হচ্ছে কুস্তি। এ দেশের মেয়েরা কঠিন খেলা কুস্তিতেও ছেলেদের চেয়ে সাফল্যের দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে। ২০১৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত ১২তম এসএ গেমসে বাংলাদেশ দলে পুরুষ ও মহিলা মোট ১৬ জন খেলোয়াড় অংশ নেয় কুস্তি ডিসিপ্লিনে। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পাহাড় অনন্তপুর গ্রামের মেয়ে কুস্তিগিরি শিরিন সুলতানার কথা গল্প শুনবো। মেয়েদের কুস্তিতে শিরিন একটি পরিচিত নাম। কুস্তিতে জাতীয় পর্যায়ে ২০১১ ও ২০১২ সালেও শিরিন জিতেছেন সোনা। দেশের বাইরে ভারতে ইন্দো-বাংলাদেশ-বাংলা আন্ত রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতেন তিনি।
ছোটবেলায় টিভিতে বসে রেসলিং দেখতে খুব ভালো লাগত শিরিন সুলতানার। তবে কখনো ভাবেননি নিজে এই খেলায় অংশ নেবেন। ২০০৮ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ আনসারে, ব্যাটালিয়ন সৈনিক হিসেবে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আনসারে ট্যালেন্ট হান্ট কার্যক্রমে জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় রেহানা পারভীনের চোখে পড়লেন শিরিন। ব্যস, নামিয়েদিলেন খেলার মাঠে। কুস্তি খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে খুব কম সময়েই তুলে ধরলেন সবার সামনে। খেলা শুরু করার পরের বছরই জিতে নিলেন জাতীয় কুস্তি প্রতিযোগিতা ২০১০ সালে (৫৫ কেজি ওজন শ্রেণীতে) সোনা। এই তো পথচলা শুরু। এক স্বাক্ষাতকারে শিরিন সুলতানা বলেছেন, ‘আমি খুব বেশি দিন খেলা শুরু করিনি। প্রতিদিন শিখছি নতুন কিছু। মন দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে চাই। অলিম্পিকের মতো বিশ্ব আসরে সোনা জেতার খুব ইচ্ছা বাংলাদেশের হয়ে সেভাবেই এগোতে চাই।’

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close