আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সাহিত্য

উত্তর-ঔপনিবেশিকতায় নজরুলসাহিত্য

najrulবিশ্বজিৎ ঘোষ:বর্তমান সময়ে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব (post-colonial Theory) গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববীক্ষা হিসেবে বিবেচিত। উপনিবেশকালীন এবং উপনিবেশ-উত্তর সাহিত্য সংস্কৃতির মূলধারা অনুধাবনে এই তত্ত্ব বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছে। আত্মসমীক্ষা এবং প্রতিরোধী চেতনাই উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের মৌল বৈশিষ্ট্য। উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধী চেতনা, কেন্দ্র ও প্রান্তের সম্পর্ক নির্ণয়, প্রতিবাদী নারী ভাবনা, মিথপুরাণের নবনির্মাণ, নিম্নবর্গ সম্পর্কে চেতনা, স্বদেশপ্রেম ও দেশজ প্রকৃতিলগ্নতা এবং আপসহীন দ্রোহচেতনাই হচ্ছে উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের প্রধান প্রধান দিক। উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের আলোকে কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষিত হলে, ভিন্ন এক নজরুলকে আবিষ্কার করা সম্ভব। এখানে তবে নজরুলসাহিত্যে উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসর্কোস ও সাহিত্যে তার প্রয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে পৃথিবীব্যাপী হতাশা, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রতিবেশ বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের উজ্জ্বল আবির্ভাব। তার কবি-মানসের শিকড় প্রেথিত ছিল নবজাগ্রত বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানসমৃত্তিকায়। রাজনীতি সচেতনতা ও জনমূল-সংলগ্নতা নজরুলের কবি চৈতন্যে এনেছিল নতুন মাত্রা। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্তের স্বপ্ন সম্ভাবনা নজরুলের কবিমানসকে করে তুলেছিল আলোক-উদ্ভাসিত। তাই রোমান্টিক অনুভবেদ্যতায় তিনি বৈষম্যমূলক ঔপনিবেশিক সমাজের পরিবর্তে কল্পনা করেছেন শোষণমুক্ত সুষম সমাজের। অসত্য অমঙ্গল অকল্যাণের রাহুগ্রাস থেকে তিনি মুক্ত করতে চেয়েছেন স্বদেশের মাটি আর মানুষকে। যুদ্ধোত্তর বিরুদ্ধ প্রতিবেশে দাঁড়িয়েও তিনি গেয়েছেন জীবনের জয়গান, উচ্চারণ করেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য বিদ্রোহের সূর্যসম্ভব বানী।

পরম আশাবাদী নজরুল স্বদেশের মুক্তি প্রত্যাশা করেছেন; ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে জাগ্রত করার আহবান জানিয়েছেন। উপনিবেশকে আঁকড়ে রাখার মানসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সুচতুর কৌশলে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করেছিল ভারতবর্ষে। ভারতের দুই বৃহৎ ধর্ম-সম্প্রদয়ায় পরস্পর বিভেদে জড়িয়ে পড়েছে বারবার। এর পাশ্চাতে ছিল একাধিক রাজনৈতিক দলের ইন্ধন। এই সাম্প্রদায়িক বিভেদ নজরুলকে ব্যথিত করেছে। তাই তিনি সচেতনভাবে হিন্দু- মুসলিমের মধ্যে সাম্প্রদায়িক-নিরপেক্ষ সম্প্রীতি প্রত্যাশা করেছেন। সত্য-সুন্দর-কল্যাণের পুজারি নজরুল চেয়েছেন সম্প্রদায়ের উর্ধে মানুষের মুক্তি। বস্তুত, সাম্যবাদী চিন্তা তার মানসলোকে সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ মানবসত্তার জন্ম দিয়েছে— হিন্দু ও মুসলমান বৈপরীত্যের দ্যোতক না হয়ে তার চেতনায় হতে পেরেছে জাতিসত্তার পরিপূরক দুই শক্তি। তাই প্রকৃত সাম্যবাদীর মতো তিনি বলেন:

কাটায়ে উঠেছি ধর্ম-আফিমের-নেশা
ধ্বংস করেছি ধর্ম যাযকী পেশা
ভাঙি’ মন্দির, ভাঙি’ মসজিদ
ভাঙিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত,
এক মানবের একই রক্ত মেশা
কে শুনিবে আর ভজনালয়য়ের হ্রেষা! (নজরুল ১৯৬৭: ৩৮৪)

উত্তর ঔপনিবেশিক তত্ত্বের সঙ্গে নজরুলের এই অসাম্প্রদায়িক মানসিতার সম্পর্ক কোথায়? উত্তর–উপনিবেশবাদ প্রতিরোধী চেতনা নিয়ে দাঁড়াতে চায় উপনিবেশের বিরুদ্ধে। এই প্রতিরোধী চেতনা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন সঙ্ঘশক্তি। সঙ্ঘশক্তির আকাঙ্ক্ষাতেই নজরুল স্বপ্ন দেখেছেন মিলিত বাঙালির, স্বপ্ন দেখেছেন মিলিত ভারতবাসীর। এ সুত্রেই তার অসাম্প্রাদায়িক চেতনা উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের প্রতিরোধী চেতনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। বস্তুত, মানুষকে, মানুষের ধর্মকে নজরুল বড় করে দেখেছেন আজীবন। তিনি চেয়েছেন মানুষের কল্যাণ, সমাজের মঙ্গল, স্বদেশের স্বাধীনতা। তাই হিন্দু কিংবা মুসলমান নয়, বিদ্রোহের জন্য মানুষের প্রতিই ছিল তার উদাত্ত আহ্বান।

ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধী চেতনা সৃষ্টির জন্য আত্মসমীক্ষা এবং আত্মশক্তির উদ্বোধন একিটি জরুরি অনুষঙ্গ। উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বে আত্মসমীক্ষার কথা গ্রামসীও জোরের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন (Gramsci 1996 : 57)। ঔপনিবেশিক শোষণ, সামন্ত-অত্যাচার এবং ধর্মী কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহীরূপে বাংলা সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করেছেন নজরুল। আত্মশক্তি উদ্বোধনের জন্য নজরুল প্রথমেই নিজেকে আবিষ্কারের কথা বলেছেন- যেমনটা করেছেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় : ‘আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ’ (নজরুল ১৯৬৭ : ২১)। নজরুলের নিম্নোক্ত ভাষ্যসমূহে আছে আত্মসমীক্ষা এবং আত্মআবিষ্কারের উদাত্ত আহ্বান:

ক. আপনাকে চেন। বিদ্রোহের মত বিদ্রোহ যদি করতে পার, প্রলয় যদি আনতে পার তবে নিদ্রিত শিব জাগবেই, কল্যাণ আসবেই। লাথির মত যদি লাথি মারতে পার, তা হ’লে ভগবানও তা বুকে করে রাখে। ভৃগুর মতো বিদ্রোহী হও, ভগবানও তোমার পায়ের ধুলো নেবে। কাউকে মেনো না, কোনো ভয়ে ভীত হয়ো না বিদ্রোহী। ছুটাও আশ্ব, চালাও রথ, হানো অগ্নিবাণ, বাজার দামামা-দুন্দুভি। বল, যে যায় যাক সে, আমি আছি। বল, আমিই নূতন করে জগৎ সৃষ্টি করব। সৃষ্টার আসন থরথর করে কেঁপে উঠুক। বল, কারুর অধীনতা মানি না, স্বদেশীরও না, বিদেশীরও না। (নজরুল ১৯৬৭ : ৬৭৩)

খ. পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল-কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে। আর এই বিদ্রোহ করতে হলে-সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে-
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ। (নজরুল ১৯৬৭ : ৬৯৭)

গ. আমি পরম আত্ম-বিশ্বাসী। আর যা অন্যায় বলে বুঝেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি-কাহারো তোষামোদ করি নাই, প্রশংসায় এবং প্রসাদের লোভে কাহারো পিছনে পোঁ ধরি নাই, -আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই, সমাজের, জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য-তরবারির তীব্র আক্রমন সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে,— তার জন্য ঘরে-বাইরে বিদ্রুপ, অপমান, লাঞ্ছনা, আঘাত ভগবানকে হীন করে নাই, লোভের বশবর্তী হয়ে আত্ম-উপলব্ধিকে বিক্রয়করি নাই, নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করি নাই, কেননা আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা, আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা। (নজরুল ১৯৬৭ : ৭২২)

—স্পষ্টতই লক্ষণীয়, উপর্যুক্ত উদ্বৃতিসমূহে নজরুলমানসের দ্রোহী সত্তার মৌল চারিত্র্য হয়েছে উন্মোচিত। বিদ্রোহের জন্য, প্রতিরোধের জন্য আত্মসমীক্ষা এবং আত্মআবিষ্কার বাসনাই এসব ভাষ্যের মূল কথা। পরাধীনতার গ্লানিতে নজরুলচিত্ত দীর্ণ হয়েছে, এবং এই গ্লানি থেকে মুক্তির অভিলাষে তিনি হয়েছেন বিদ্রোহী। তবে, কেবল দেশের স্বাধীনতা-কামনাতেই তার দ্রোহীচিত্তের তৃপ্তি ছিল না- তার বিদ্রোহ ছিল একাধারে ভাববাদী ও বস্তুবাদী। তার বিদ্রোহ ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার, সকল আইন-কানুনের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, ইতিহাসনিন্দিত চেংগিসের মতো নিষ্ঠুরের জয়গানে মুখর, ভৃগুর মতো ভগবানের বুকে পদাঘাত-উদ্যত, মানবধর্ম প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়সংকল্প, ধ্বংসের আহ্বানে উচ্ছ্বসিত, সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় উদ্বলিত।

প্রতিরোধ-বাসনায় কবিতা নজরুলের কাছে হয়ে উটেছে সামাজিক দায়িত্ব পালনের মাণিত আয়ুধ। নজরুলের প্রতিরোধচেতনা বা দ্রোহভাবনার মধ্যে ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়:

ক. অসত্য অকল্যাণ অমঙ্গল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ;
খ. স্বদেশের মুক্তির জন্য ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; এবং
গ. শৃঙ্খল-পরা কবির ‘আমিত্ব’-কে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিদ্রোহ।

—বস্তুত, নজরুলের সৃষ্টিকর্মে এই ত্রয়ীধারা সর্বদা সক্রিয় থেকেছে। তার প্রতিরোধচেতনা ছিল সৃষ্টিশীল, ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল থেকে স্বদেশের মুক্তিকামনায় আকুল। তিরিশি অবক্ষয় হতাশা কিংবা নৈরাশ্যবাদিতা-যৌনতা কোনক্রমেই তার কবিমানসকে আচ্ছন্ন করেনি। তার বিদ্রোহ সৃষ্টিশীল বলেই তিনি ধ্বংসের মাঝে খুঁজে পেয়েছেন নতুন সৃষ্টির আশ্বাস। অসুন্দরের মৃত্যুকামনা করে তিনি বরণ করেছেন চিরসুন্দরকে:

ধ্বংস দেখে ভয় তোর?-প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন-জীবন-হারা অসুন্দরে করতে ছেদন।
তাই সে এমন কেশে-বেশে
প্রলয় ব’য়েও আসছে হেসে’-
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর। (নজরুল ১৯৬৭ : ২১)

একথা অনস্বীকার্য যে, কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোগ করেছেন অসত্য অন্যায় অকল্যাণ ও অমঙ্গলের বিরুদ্ধে-সামন্তিতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে। সন্দেহ নেই, তার বিদ্রোহ মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও কল্যাণবোধ থেকে উৎসারিত। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি আমিত্ব বা ব্যক্তিসত্তার মুক্তিপ্রত্যাশী। নবজাগরণের ফলে ধর্মশাসিত শৃঙ্খল-পরা মানুষের মুক্তি ঘটেছে, মুক্তি ঘটেছে মানুষের অবরুদ্ধ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ‘আমি’ এই নবজাগ্রত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের শিল্প-নির্মিতি। মহাকাশ ছাপিয়ে, ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে নজরুল হয়েছেন বিশ্ববিস্তারী- আমিত্বের অহঙ্কারে নিজেকে উন্মোচিত করেছেন এই প্রত্যয়দীপ্ত চরণগুচ্ছে:

আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ পাতাল মর্ত্ত্য।
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির! (নজরুল ১৯৬৬ : ২৩)

—উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব আত্মসমীক্ষার কথা বলে, বলে আত্মশক্তি উদ্বোধনের কথা। গোটা ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিই তো আত্মসমীক্ষা ও আত্মশক্তি উদ্বোধনের এক অনুপম শিল্পপ্রতিমা। বস্তুত, প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি আবিষ্কার করতে চেয়েছেন মানুষের আত্মতা ও আত্মশক্তির বিশালতা।

ঔপনিবেশিক শক্তিকে প্রতিরোধের বাসনা থেকে সৃষ্টিশীল প্রতিভা, শক্তি সংগ্রহের জন্য, অবগাহন করেন মিথ-পুরাণ-ইতিহাস-ঐতিহ্য-রূপকথা-উপকথার জগতে। সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞার জাদুস্পর্শে সংরক্ত সমকালের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে মিথ-পুরাণ ইতিহাস-ঐতিহ্য লাভ করে পুনর্জন্ম। পুরাণ ইতিহাস ঐতিহ্য ও মিথিক অনুষঙ্গ কবির চেতনায় সঞ্চার করে অসীম অতল অতুল শক্তির উপলব্ধি। এই শক্তিই কবিকে বর্তমান অবরুদ্ধ অবস্থা ভাঙার সাহস জোগায়- তাকে করে তোলে দ্রোহী-প্রতিবাদী-প্রতিরোধী এবং প্রত্যাঘাতপ্রবণ। মিথ কবিকে করে তোলে স্বপ্নমুখী-সে স্বপ্ন ব্যক্তিক নয়, সামষ্টিক। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় বিল ময়ার্সের সঙ্গে কথোপকথনকালে জোসেফ ক্যাম্বলের অভিমত- ‘স্বপ্ন আমাদের সচেতন জীবনের ভরসা-গভীর, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা; আর মিথ আমাদের সমাজের স্বপ্ন। মিথ হলো গণস্বপ্ন, পক্ষান্তরে স্বপ্ন হচ্ছে ব্যক্তিগত মিথ’ (Campbell 1988:49) ।

নজরুল-কাব্যের কেন্দ্রীয় ভাব দ্রোহ ও প্রতিরোধ, আর এই দ্রোহ ও প্রতিরোধ আকাঙ্ক্ষার সপক্ষে শক্তি সঞ্চয়ের বাসনায় নজরুলের ইতিহাস-ঐতিহ্য-পুরাণস্মরণ। ঔপনিবেশিক শোষণ এবং যুদ্ধোত্তর অবক্ষয় বিপর্যয় ও শূণ্যতার পটভূমিতে চীবনের পরমার্থ আবষ্কারে নজরুল সচেতভাবে স্মরণ করেছেন ঐতিহাসিক-পৌরাণিক নানা চরিত্র ও অনুষঙ্গ। তার কবিতায় ইতিহাস-ঐতিহ্য মিথ-পুরাণ ব্যবহার-বৈচিত্র্যে হয়ে উঠেছে শিল্পমণ্ডিত, তা বিকিরণ করেছেন নতুন ব্যঞ্জনা নবতর মাত্রা। অর্জুন দুর্বাসা ভীম বিশ্বামিত্র জমদগ্নি বিষ্ণু পরশুরাম বলরাম ভৃগু প্রহ্লাদ চণ্ডী দুর্গা শিব প্রভৃতি পৌরাণিক চরিত্র এবং পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসপুঞ্জ কিংবা মধ্যযুগীয় সাহিত্য-ঐতিহ্য অথবা ইয়োরোপীয় অর্ফিয়াস প্লুটো ইত্যাদি নজরুল-কবিতায় নির্মান করেছে মিথ-পুরাণ ও ঐতিহ্যের এক অতি চৈতন্যলৌকিক বলয় (আকরম ১৯৮৫ : ৭৫) । মিথ ও পুরাণের বহুমাত্রিক ব্যবহারে নজরুলের কবিচৈতন্যে সামূহিক নির্জ্ঞান ও ব্যক্তিগত উপলব্ধির মেলবন্ধন (Jung 1974 : 205-32) ঘটেছে।

বাংলা কবিতায় নজরুলের বিশিষ্টতা এই যে, ভারতীয় মিথ-পুরাণ এবং পশ্চিম এশীয় ঐতিহ্য ব্যবহারে তিনি অর্জন করেছেন অনন্য সাফল্য। নান্দনিক ঐকান্তিকতায় এবং জৈবসমগ্র ঐক্যসূত্রে দুই ভিন্ন উৎসের শিল্প-উপাদান নজরুল-কবিতায় সৃষ্টি করেছে মূর্ছনার ঐকতান। এ সূত্রে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন নজরুলের ঐতিহ্যিক-উত্তরাধিকার প্রসঙ্গটি। উত্তরাধিকারের ব্যাপকতায় কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ঋব্ধিশালী (মোতাহের ১৯৭২ : ৩৩-৩৪)। নজরুল জন্মসূত্রে ভারতীয়, তাই ভারথীয় উত্তরাধিকারকে তিনি আপন উত্তরাধিকার হিসেবেই জেনেছেন এবং গ্রহন করেছেন। অপরদিকে ধর্মসূত্রে তিনি ছিলেন পশ্চিম এশীয় তথা ইসলামের অতীত গৌরব এবং ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। তিনি সচেতনভাবে উভয় ঐতিহ্যকে লালন করেছেন আপন কবিসত্তায়। তাই একই কবিতায় ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে তিনি সার্থকভাবে মেলাতে পেরেছেন পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য- যে হাতে লিখেছেন শ্যামাসঙ্গীত-শাক্তপদ, সেই হাত দিয়েই লিখতে পেরেছেন গজল আর ইসলামি গান। উভয় ঐতিহ্য থেকে শক্তি ও প্রেরণা চয়ন করে নজরুল তা ব্যবহার করতে চেয়েছেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-যুদ্ধে। ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে নজরুল প্রত্যাশা করেন দুর্গার আবির্ভাব, যে দুর্গা পৌরাণিক আসুরিকতাকে ধ্বংস করার মানসে স্বর্গলোক থেকে নেমে এসেছিলেন মর্তে, নিপীড়িত মানুষকে বাঁচানোর জন্য:

দেখ মা আবার দনুজ-দলনী
অশিব নাশিনী চণ্ডী-রূপ
দেখাও মা ঐ কল্যাণ-করই
আনিতে পারে কি বিনাশ স্তূপ।
শ্বেত-শতদল-বাসিনী নয় আজ
রক্তাম্বরধারিণী মা,
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
সৃষ্টির নব পূর্ণিমা। (নজরুল ১৯৬৭:২৭)

ঔপনিবেশিক শক্তিকে ধ্বংস করে নজরুল নির্মাণ করতে চেয়েছেন একটি সুষম বণ্টনভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র। তার এই আকাঙ্ক্ষার স্মারক হয়ে আসে পুরাণের শিব-নটরাজ সত্তায় শিব ধ্বংসস্তূপের উপর নির্মাণ করে সৃষ্টির সৌধ, যা নজরুলের মানস-আকাঙ্ক্ষারই রূপান্বিত ছবি:

দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু চাঁদের কর,
আলো তার ভরবে এবার ঘর। …
ঐ ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তরে ডর?
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।
বধূরা প্রদীপ তুলে ধর।
কাল ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর। (নজরুল ১৯৬৭:২৭)

পশ্চিম এশীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য মিথ-উৎস ব্যবহারেও নজরুল তার দ্রোহচেতনাকেই রেখেছেন কেন্দ্রীয় ভরকেন্দ্রে। প্রতিরোধ-যুদ্ধের জন্য শক্তি দরকার, এবং শক্তির সন্ধানেই তিনি হাজির হয়েছেন পশ্চিম এশিয়ার ঐতিহ্যলোকে। মোহররমের শোককে কবি পরিণত করেন শক্তিতে, হযরত ইব্রাহিমের ত্যাগধর্মকে তিনি সঞ্চারিত করেন দেশের তরুন-সৈনিকদের মানসলোকে। লক্ষণীয় নিম্নোক্ত চরণগুচ্ছ :

ক. ফিরে এলো আজ সেই মোহররম মাহিনা,-
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। (নজরুল ১৯৬৭ : ৩৯)

খ. ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন।
জোর চাই, আর যাচনা নয়,
কোরবানী-দিন আজ না ওই?
বাজনা কই? সাজনা কই?…
আজ আল্লাহর নামে জা্ন কোরবানে ঈদের পূত বোধন।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন। (নজরুল ১৯৬৭ : ৪১)

—উপর্যুক্ত দু’টি উদ্ধৃতিতেই পশ্চিম এশীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রতিরোধী যুদ্ধের জন্য নজরুলকে সঞ্চার করেছে সীমাহীন শক্তি ও সাহস।

নিম্নবর্গ বা প্রান্তজনের উত্থানবাসনা উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। বাংলার সামাজিক স্তরবিন্যাস নজরুল ছিলেন প্রান্তবাসী, তার অবস্থান ছিল নিম্নবর্গে। নিম্নবর্গের প্রতি ভালোবাসা, প্রান্তজনের প্রতি দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার থেকে নজরুল কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন ছোটগল্প উপন্যাস প্রবন্ধ। উৎপীড়িত বা প্রান্তজনের মুক্তির জন্যই নজরুল বিদ্রোহ করেছেন। এই বিদ্রোহ বা প্রতিরোধ-যুদ্ধে নজরুল পুরুষের পাশাপাশি নারী-শক্তিকেও আহ্বান করেছেন। ‘বারাঙ্গনা’, ‘নারী’-এসব কবিতায় পাওয়া যায় এই প্রত্যয়-নজরুল নারীকে প্রাকৃতিক লৈঙ্গিক পরিচয়ে না দেখে, দেখেছেন সামাজিক জেন্ডার দৃষ্টিকোণে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নিম্নবর্গ তথা প্রান্তজনের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন – ‘Can the subaltern speak’ (Gayatri 1990 : 31)? নজরুলের কবিতা ও কথাসাহিত্যে নিম্নবর্গ কথা বলেছে, প্রতিবাদ করেছেন, বিদ্রোহ করেছে। ‘ব্যথার দান’ গল্পের গুলশান, ‘রাক্ষুসী’ গল্পের বিন্দি, ‘পদ্মগোখরো’ গল্পের জোহরা, কুহেলিকা উপন্যাসের জাহাঙ্গীরের মা, কিংবা জয়তী ও চম্পা, বাঁধনহারা-র আয়েশা, মৃত্যুক্ষুধা-র প্যাকালের মা কিংবা মেজ বউ নিম্নবর্গ বা প্রান্তজনের লক্ষণরেখা ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে আলোকিত পৃথিবীতে। জাহাঙ্গীর কিংবা আনসারের মুখেও আমরা শুনি ওই প্রান্তজনের গলা-ফাটানো উত্থান-কথা। অতএব, সামসময়িক সাহিত্যের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে, নজরুলের কথাসাহিত্যের এই মর্ম উপলব্ধি করে গায়ত্রীর জিজ্ঞাসার উত্তরে আমরা বলতে পারি – ‘Yes, the subaltern can also speak’ ।

নজরুল বিদ্রোহী কবি, নজরুল প্রান্তজনের লেখক। তার রচনায় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের কথা উচ্চকণ্ঠে ঘোষিত হয়েছে। তিনি তার কবিতায়, কথা-সাহিত্যে, প্রবন্ধে নিম্নবর্গের জীবনচিত্র অঙ্কনই করেননি, বরং তিনি কামনা করেছেন নিম্নবর্গের মানুষের, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভ্যুত্থান। উত্তর-ঔপনিবেশিক নজরুল বাংলা সাহিত্যে যথার্তই এক বিরল, ব্যতিক্রমী, প্রাতিস্বিক, অদ্বিতীয় এবং অনতিক্রান্ত প্রতিভা।

লেখক: ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: ওয়েব সাইট

ঢাকা ২৬ মে (ওমেন আই)এলএইচ//

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

Close
Back to top button
Close
Close