আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সাহিত্য

হাসির দাম কোটি টাকা

হাসিনা সাঈদ মুক্তা

সুমী সকাল থেকেই কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না।মনটা তার ছটফট করছে ফজরের নামাজের পর থেকেই।
কি আজব মনরে বাবা,কারন নাই অকারনে পাখির মতো চঞ্চলতা করছে!কিন্তু এ অসময়ে কেন।
নিজের মনেই প্রশ্ন করে সুমী।
খুব লক্ষী মেয়ের মতো ভোর বেলায় উঠে পড়ে। ফজরের নামাজ দিয়ে বেলা শুরু করতে পারলেই যেন সারাক্ষন ভালো কাটে। সত্যিই তাই। তারপর রান্নাঘরে নাস্তার আয়োজন করে। রাহিমা খালাকে জাগিয়ে দেয়। দুঃসর্ম্পকের খালা হয়,আপন বলতে কেউ নেই। সুমীর ছোটবেলা থেকেই তাদের সাথে আছে পরিবারের মতো। খালা রুটি বেলে,সবজি কেটে দেয়। সুমী গরম তাওয়ায় রুটি ছেঁকে অন্য চুলোয় সবজি বসিয়ে দিয়ে মেয়ের টিফিন রেডি করে। এবার তার একমাত্র মেয়ে ঝুমুর স্কুলের জন্য
প্রস্তুতি। এরপর সকালে প্রকৃতির তরতাজা বিশুদ্ধ বায়ু সেবন করতে করতে মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসে সুমী। কখনোবা ঝুমুর নানা ভাই অথবা মিলন মামাও দিয়ে আসে স্কুলে।বাসায় নিয়ে আসার কাজটা অবশ্য তারাই করে।
ঝুমুকে স্কুলে দিয়ে সুমী তার স্কুলে চলে যায়, যেখানে সে শিক্ষকতা করে। স্কুলে বাচ্চাদের পড়াতে ভালই লাগে সুমীর। তাছাড়া একটা সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের নিয়মিত কলামিস্ট হিসেবেও পার্টটাইম কাজ করে সে। অপুর্বর সাথে পরিচয় সেখানেই।
চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হামবড়া ভাব নিয়ে কথা বলা ভদ্রলোকের সম্ভবত স্বভাব। কিন্তু তার ভেতরে যে শিশুর মতো একটা মন আছে তাও দেখে সুমী বিস্ময়ে!
সুমীকে তার ম্যাগাজিন পত্রিকা অফিসের স্যার খুবই পছন্দ করেন। নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করেন। ঝুমুর বাবা অর্থাৎ সুমীর স্বামী তারেক হাসান রোড এক্সিডেন্টে মারা যায় প্রায় দুবছর হতে চলল। দূর্ঘটনার পরপরই সুমী এখানে কাজ পেয়ে যায়। আর অপূর্বর সাথে পরিচয় একবছরেরর মতো। সুদর্শন অপূর্ব পেশায় একজন ফোটগ্রাফার। মডেলদের ছবি তোলা ও প্রয়োজনে রিপোর্ট করাও তার কাজ। নামীদামী মডেল এবং বর্তমান প্রজন্মের তরুন মডেল প্রায় সবার ছবিই সে তুলে দেয়। নিজের একটা স্টুডিও আছে মোহাম্মাদপুর আদাবরে। আর সুমী থাকে মিরপুরে।
সুমীর সাথে অপূর্বর পরিচয়পর্ব তেমন মধুর ছিল না। কারন মা দিবসকে ঘিরে সুমী ও ঝুমুরের কিছু সেশন করে দিতে বলেছিল তার স্যার আজিজুর রহমান।
“কি কারনে যেন সেদিন অপূর্ব সাহেবের মাথা গরম ছিল? মডেলরা কাজ করানোর পর ঠিকমতো টাকা না দিয়ে ঘোরালে মেজাজ খুবই চড়ে যায় তার। আর বেশী ক্ষেপে যায় যদি সময় জ্ঞান বা পোশাক জ্ঞান না থাকে। তাছাড়া উঠতি কিছু মেয়ে মডেলদের বিরক্তিকর ফোন আর প্রেম নিবেদনে বেচারা অতিষ্ঠ।
তার উপর তার স্যার চেনা নাই, জানা নাই অচেনা এক মহিলা ও তার মেয়ের ছবি তাকে দিয়ে তোলাচ্ছেন।স্যারের অতি প্রিয় সুমী রহমান।সবকিছুতে স্যার ঐ মেয়ে আর তার মেয়েকে টানেন।আদিখ্যেতাও বলা যায়।
কিন্তু কেন?
মেয়েটি অর্থাৎ সুমী তো আহামরি সুন্দরী নন। এখনকার মডেলদের মতো ফিগারসুলভও নন।স্যারের মাঝে মাঝে কি হয় মেয়েদের এসব মায়াটায়া কেন করেন কে জানে।
অপূর্বের বিরক্তি।
সুমী ও তার মেয়ে ঝুমু এক্সপ্রেশন দিচ্ছিল ঐদিন অপূর্ব চৌধুরীর কাছে। কিন্তু তার মনে হল,অপূর্ব চৌধুরীর কোন এক্সপ্রেশনই পছন্দ হচ্ছে না। প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে যেন তাদের ছবি তুলে দিচ্ছিলেন। আর একটু পরপর ফোনে যেন কাকে ধমকাচ্ছিলেন।
কি আজব আচরন রে বাবা।
ভদ্রমহিলার সাথে কিভাবে আচরন করতে হয় জানা নেই এই চিত্রগ্রাহকের।
খুব রাগ হয়েছিল সুমীর প্রথম পরিচয়ে।
কিন্তু একমাসের ভিতর পরিবর্তন লক্ষ্য করল সুমী। কেমন করে যেন অপূর্বর চোখে সুমী হয়ে উঠল মায়াবতী!
কারন অফিসে একদিন সুমী খাবার রান্না করে নিয়ে এসেছিল। ঐদিন অফিসে স্যার আর অপূর্ব ছাড়া আর তেমন কেউ ছিল না। স্যারও তেমন খেতে পারেনি। হালকা গোলাপী আর সাদা স্যুটে সুমী এসেছিল,
মাথায় ওড়না বরাবরই ওর ফ্যাশন হয়তো।
অপূর্ব এবার ভালো করে তাকাল সুমীর দিকে, ভাসাভাসা কাজল পড়া চোখ। সেই চোখে মেয়েটির সারল্যতায় আর চাহনীতে এক অদ্ভুত মায়া আছে।
স্যার তো ঠিকই বলেছন,
সুমীর চেহারাটায় অসম্ভব মায়া।
কিন্তু সুমী অপূর্বকে ঐদিন খুব যতœ করে খাওয়ালো। অপূর্বের মনে হচ্ছিল তার মায়ের কথা সেসময়।
আচ্ছা কি দেখে আমাকে এত পছন্দ করলেন?আপনার আশেপাশেই তো কত সুন্দর মেয়েই আছে।
সুমীর কৌতুহল।
তা তো বলতে পারবো না। ভালোলাগা,ভালোবাসার কি সঠিক কারন লাগে।
কি বল্লেন ভালোবাসা? ভালোবাসেন আমাকে আপনি।
হ্যা বাসি।
সুমীর এই কথাটা কোনভাবেই বিশ্বাস হয়নি সেদিন। মনে হচ্ছিল অপূর্ব তার সাথে ফ্ল্যাটারিং করছে। বা কপট পুরুষরা যা করে মেয়েদের সাথে।
কিন্তু সময় যাওয়ার সাথে সাথেই সুমী জানতে পারলো অনেক কিছুই। অপূর্বরও পূর্বে বিয়ে হয়েছিল কোন এক সুন্দরী ও খ্যাতনামা মডেলের সাথে। একবছরও সংসার হয়নি তাদের। অপূর্বরও ছেলে আছে দেখতে অপূর্বের মতোই। অপূর্বর বাবা মা কানাডায় থাকেন। আরও দুভাই তারাও দূরে থাকে। কোন এক নিঃসঙ্গমুহূর্তে অপূর্ব সুমীর আরো কাছে আসে। সুমীর কাঁধে মাথা দিয়ে কেঁদে ফেলে এসব কথা বলে অপূর্ব বড় আবেগী হয়ে।
তারপর থেকে আর কোন মেয়েকে সে বিশ্বাস করতে পারেনা। এর মাঝে সুমী অপূর্বর যতœ নেয়। অফিসে যখনই আসত প্রায়ই খাবার আনতো। কিছু খাবার বক্সে করে অপূর্বকে দিয়ে দিত নিজের হাতে, সযতনে ।
এদিকে সুমীকে অপূর্ব তার বাইকে করে বাসায় পৌঁছে দেয় সুযোগ পেলেই।
একদিন হঠাৎ শুনতে পায় সুমী জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছে তার স্কুলে। কিছুটা অপূর্বের সাথে অভিমান করেই।
শোনা মাত্রই অপূর্ব স্কুলে আসে তার, বাইক নিয়ে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় সুমীকে। রেষ্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে সুমীকে যতেœর সাথে স্যুপ খাইয়ে দেয়। ঝুমুকে পর্যন্ত স্কুল থেকে বাসায় নেয়ার দায়িত্ব নেয় অপূর্ব। সুমীর চোখের কোণে জমে অশ্রæবিন্দু। অপূর্ব টের পায়।
কি হলো লক্ষীটি…..কাঁদেনা।
আমার পাগলীটা।
কি যে ভালো লাগে সুমীর অপূর্বের এই আদুরে ডাকে!
সুমীকে পরম মমতায় বাহুবন্ধনে আলিঙ্গন করে।
দুজন দুজনের মাঝে খুঁজে পায় নতুন পৃথিবী।
আজ সকালে ছোটফোট হওয়ার কারন সেটাই। অপূর্বের বাবা মা এসেছেন কানাডা থেকে। যেকোন সময় তারা সুমীর বাসায় আসবেন।
সুমীর উৎকন্ঠার শেষ নেই। তাকে দেখে কি পছন্দ হবে?
কিন্তু অপূর্ব বলে অন্যকথা, দেখো সুমী তুমি হয়তো জানো না আমি আর কখনো বিয়ে না করার প্রতিজ্ঞায় ছিলাম। কিন্তু আমি যে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি, এটাই তাদের কাছে অনেক।আর তোমার মতো লক্ষী একটা মেয়েকে বউ করে পাচ্ছি এটা এক্সটা বোনাস।
সুমী গাল টিপে খিলখিল শব্দে হেসে ওঠে।
অপূর্ব সুমীর হাসি শোনামাত্রই চুপ হয়ে যায়। সুমীর জিজ্ঞাসা, কি হলো, কই গেলা।
ফোনের ওপাশ থেকে বলে ওঠে।
অপূর্ব আদুরে কন্ঠে বলে, কিছুনা লক্ষীটি….তোমার হাসি শুনছিলাম।
সুমী ফের জিজ্ঞেস করে, হুম আমার হাসি বুঝি নতুন শুনছো?
অপূর্ব এবার বিস্ময়ে বলে, না তোমার সবকিছুই আমার নতুন লাগে। আগে একজনের হাসি (প্রাক্তন প্রেমিকা ও স্ত্রী) শুনে বলতাম তোমার হাসির দাম এককোটি টাকা। আর এখন তোমার হাসি শুনে মনে হয়, তোমার হাসি দশ কোটি টাকা!
এভাবেই গল্প এগোয়। নতুন স্বপ্নে আবারো বিভোর হয় সুমী অপূর্বের নতুন গল্প। দুজনের হাসি ও সারল্যে মনে হয়, এ অদ্ভুত সুন্দর হাসির শোনার জন্যেই বুঝি এ পৃথিবী? যার মুল্য এখন দুজন দুজনের কাছে কোটি টাকার চেয়ে দামী।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

Close
Back to top button
Close
Close