আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আপন ভুবনসাহিত্যস্লাইড

নারীবাদী ও নির্বাসিত সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিনের জন্মদিন আজ

ওমেনআই ডেস্ক : বাংলাদেশের নারীবাদী ও নির্বাসিত সাহিত্যিক ও চিকিৎসক তসলিমা নাসরিনের ৫৬তম জন্মদিন আজ। ১৯৬২ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আজ জন্মদিন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ এবং ভারতের বহু ভক্ত তার ছবি অঙ্কিত টি-শার্ট পড়ে ফেসবুকে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

কেবল লেখালেখির কারণে নব্বইয়ের দশকে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে দেশত্যাগে বাধ্য হন তিনি। বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে একজন উদীয়মান কবি হিসেবে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করে তসলিমা এই শতকের শেষের দিকে নারীবাদী ও ধর্মীয় সমালোচনামূলক রচনার কারণে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন।

তিনি তাঁর রচনা ও ভাষণের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা, মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ ও মানবাধিকারের প্রচার করায় ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীদের রোষানলে পড়েন ও তাঁদের নিকট হতে হত্যার হুমকি পেতে থাকায় ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করতে বাধ্য হন। তিনি কিছুকাল যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন। বর্তমানে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক ভারতে অজ্ঞাতবাসে অবস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।

উইকিপিডিয়াতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তাঁর মা ঈদুল ওয়ারা গৃহিনী এবং পিতা রজব আলী পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পাস করেন।

১৯৭৮ সালে তিনি আনন্দ মোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পাস করেন। এরপর তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৮৯ সালে তিনি সরকারি গ্রামীণ হাসপাতালে এবং ১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মিটফোর্ড হাসপাতালে স্ত্রীরোগ বিভাগে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

তসলিমা সাহিত্য জীবন শুরু করেন তেরো বছর বয়স থেকে কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। কলেজে পড়ার সময় ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি সেঁজুতি নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। ১৯৭৫ সালে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তসলিমার কবিতা প্রকাশিত হয়।

তসলিমার জন্মদিন উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশে অসংখ্য ভক্ত তার ছবি অঙ্কিত টি-শার্ট পড়ে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা দিচ্ছেন। তাদের একজন কামেলিয়া শারমিন চূড়া একটি ছবি পোস্ট করে ফেসবুকে লিখেছেন, ঢাকার অলিগলি যেখানে যুগল হাঁটা নিষিদ্ধ… মুখোরিতো আন্দোলন নিষিদ্ধ…রক্তকবরী নিষিদ্ধ…ফেস্টুন…বড় চুলো ছেলে আর দস্যি মেয়ে নিষিদ্ধ…গাছ নিষিদ্ধ…পাখি নিষিদ্ধ…বৃষ্টিতে ভেজা শরীর নিষিদ্ধ…চুমু নিষিদ্ধ…চিৎকার করে গাওয়া নিষিদ্ধ…একজন তসলিমা নাসরিন নিষিদ্ধ…! মেয়েদের বুকও নিষিদ্ধ…! নিষিদ্ধ বুকে নিষিদ্ধ তসলিমা নিয়ে নিষিদ্ধ রাস্তায় হাঁটছি। কাটাকুটি করে শুদ্ধ! শুভ জন্মদিন তসলিমা নাসরিন।

১৯৮৬ সালে শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা নামক তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। ১৯৮৯ সালে নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে ও ১৯৯০ সালে আমার কিছু যায় আসে না কাব্যগ্রন্থগুলি প্রকাশিত হয়। এই সময় তসলিমা ঢাকা হতে প্রকাশিত নঈমুল ইসলাম খান দ্বারা সম্পাদিত খবরের কাগজ নামক রাজনৈতিক সাপ্তাহিকীতে নারী অধিকার বিষয়ে লেখা শুরু করেন।

তাঁর কাব্যগ্রন্থ ও সংবাদপত্রের কলামে নারীদের প্রতি মুসলিম মৌলবাদীদের শোষণের কথা লেখায় ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মৌলবাদীরা এই পত্রিকার অফিস ভাঙচুর করে। এই সময় নির্বাচিত কলাম নামক তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধসঙ্কলন প্রকাশিত হয়, যার জন্য ১৯৯২ সালে তসলিমা আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৯৩ সালের মধ্যে অতলে অন্তরীণ, বালিকার গোল্লাছুট ও বেহুলা একা ভাসিয়েছিল ভেলা নামক আরও তিনটি কাব্যগ্রন্থ; যাবো না কেন? যাব ও নষ্ট মেয়ের নষ্ট গল্প নামক আরো দুইটি প্রবন্ধসঙ্কলন এবং অপরপক্ষ, শোধ, নিমন্ত্রণ ও ফেরা নামক চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়।

১৯৯৩ সালে লজ্জা নামক তাঁর পঞ্চম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে বাংলাদেশের মুসলিমদের দ্বারা একটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের ওপর অত্যাচারের বর্ণনা করা হয়। এই উপন্যাসটি প্রকাশের পর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সন্ত্রাসীরা তসলিমার ওপর শারীরিকভাবে নিগ্রহ করে ও তাঁর এই উপন্যাস নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবী জানায়।

গ্রন্থমেলা কর্তৃপক্ষ তাঁকে মেলায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। এই বছর অক্টোবর মাসে কাউন্সিল অব ইসলামিক সোলজার্স নামক এক মৌলবাদী সংগঠন তাঁর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে। তসলিমা নাসরিনের সাতটি আত্মজীবনী গ্রন্থের অধিকাংশ বাংলাদেশ ও ভারত সরকার দ্বারা নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয়।

আমার মেয়েবেলা নামক তাঁর প্রথম আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে ইসলাম ধর্ম নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হলেও ২০০০ সালে এই বইয়ের জন্য তসলিমা দ্বিতীয়বার আনন্দ পুরস্কার জয় করেন। ২০০২ সালে তাঁর দ্বিতীয় আত্মজীবনী উতাল হাওয়া বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয়।

২০০৩ সালে ক নামক তাঁর তৃতীয় আত্মজীবনী বাংলাদেশ উচ্চ আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে এই বইটি দ্বিখন্ডিত নামে প্রকাশিত হলেও ভারতীয় মুসলিমদের একাংশের চাপে নত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বইটি নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হলে সরকারের এই সিদ্ধান্ত লেখক মহলে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। এই নিষেধাজ্ঞা ২০০৫ সাল পর্য্যন্ত বলবৎ ছিল। ২০০৪ সালে সেই সব অন্ধকার নামক তাঁর চতুর্থ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তিনি ১৯৯৪ সালে সুইডেনে ও ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে বসবাস করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি সুইডেন ফিরে গেলে রাজনৈতিক নির্বাসিত হিসেবে জাতিসংঘের ভ্রমণ নথি লাভ করেন। এই সময় তিনি সুইডেনের নাগরিকত্ব লাভ করেন ও সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নিকট তাঁর বাংলাদেশের পাসপোর্ট জমা দেন।

১৯৯৮ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। এই সময় তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বাংলাদেশ সরকারের নিকট দেশে ফেরার অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হলে তিনি জাতিসংঘের ভ্রমণ নথি ত্যাগ করে সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে তাঁর বাংলাদেশের পাসপোর্ট ফেরত পান ও বিনা অনুমতিতে বাংলাদেশ প্রবেশ করেন। বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে পুনরায় জামিন-অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা রুজু হলে তিনি পুনরায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন।

দীর্ঘ ছয় বছর অপেক্ষার পর ২০০০ সালে তিনি ভারতে প্রবেশ করার ভিসা সংগ্রহ করতে সমর্থ হলে তিনি কলকাতা যাত্রা করেন। এই বছর মার্চ মাসে তিনি শোধ নামক তাঁর একটি উপন্যাসের মারাঠি ভাষায় অনুবাদকর্মের প্রচারে মুম্বই শহরে পৌঁছনোর সময় তসলিমা বিদ্বেষীরা তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেন। ২০০২ সালে তসলিমার পিতা মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলে তসলিমার বাংলাদেশ প্রবেশে অনুরোধ করে ব্যর্থ হন।

বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে উইকিপিডিয়া বলছে, ১৯৮২ সালে তসলিমা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র প্রেমে পড়েন এবং গোপনে বিয়ে করেন। ১৯৮৬ সালে তাঁদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানের সাথে তাঁর বিয়ে এবং ১৯৯১ সালে বিচ্ছেদ হয়। তিনি ১৯৯১ সালে সাপ্তাহিক বিচিন্তার সম্পাদক মিনার মাহমুদকে বিয়ে করেন এবং ১৯৯২ সালে তাঁদের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়। তসলিমার কোন সন্তান নেই।

তসলিমা নাসরিনের জীবনভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র নির্বাসিত ২০১৪ সালে মুম্বাই চলচ্চিত্র উৎসবে মুক্তি পায়। ২০১৫ সালে এই চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র বিভাগে ৬২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছে।

নির্বাসিত এ সাহিত্যিক বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় লেখালেখির পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সাময়িকী এবং পত্রপত্রিকায়ও নিয়মিত লেখালেখি করছেন।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close