আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
নারী সংগঠন

ম্যাকিবাকা : ফিলিপিনো বিপ্লবী নারী আন্দোলন

ওমেনআই ডেস্ক: স্পেনীয় ও মার্কিন উপনিবেশ, জাপানি ফ্যাসিস্ট আক্রমণ এবং স্থানীয় সামন্ত শোষণের বিরুদ্ধে ফিলিপিনো নারীদের অস্ত্র হাতে নেবার ইতিহাস গৌরবময়।  পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারাও যুদ্ধ করেছে, ত্যাগ স্বীকার করেছে অনেক। স্পেনীয় উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে গ্যাবরিয়েলা (Gabreila) জীবন দেয়।  তাঁর সে আত্মত্যাগ আজো ফিলিপিনো নারীদেরকে বিপ্লবী সংগ্রামে উৎসাহিত করে।  কিন্তু আজকে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সশস্ত্র বাহিনীতে নারীরা যে ক্রমবর্ধিতহারে যোগ দিচ্ছে ফিলিপাইনের ইতিহাসে তার নজির নেই। বিপ্লবের সৈনিক হিসেবে নারীরা এখন গেরিলা ঘাঁটিতে, গ্রামে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায়, সংগঠনের দায়িত্বপূর্ণ পদে, নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।  নারী গেরিলা ও কৃষক নারীদের দেখা যায় সভায়। অফিস-আদালত ও মিলিটারি ক্যাম্পমুখী মিছিলে।  নারী শ্রমিকেরা যোগ দেয় সড়ক অবরোধ করতে।  র‌্যালির অগ্রভাগে থাকে সাধারণ নারীরা।  তারা সরকারি নির্মূল বাহিনীর বিরুদ্ধে বাড়ির চারপাশে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। সংখ্যালঘু নারীরা, পিঠে শিশু সন্তান নিয়ে, সরকারি ও বহুজাতিক উন্নয়ন প্রকল্পের স্বার্থে ভিটেমাটি উচ্ছেদের প্রতিবাদ জানায়।
এই নারীদের সংগঠিত করেছে ম্যাকিবাকা (MAKIBAKA)।  ’৭০এর দশকে মার্কোস সামরিক শাসনের দমন-নির্যাতনের মধ্যে ম্যাকিবাকা একটি গোপন নতুন বিপ্লবী নারী সংগঠন হিসেবে জন্মলাভ করে। এর প্রধান কাজ জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ বাস্তবায়নে গণমুক্তি বাহিনীর (NPA) সশস্ত্র প্রচার ইউনিট, গণবাহিনী ও সশস্ত্র গেরিলা ইউনিটে নারীদের বৃহত্তম অংশ, বিশেষ করে কৃষক নারী ও শ্রমিকদের নিয়োগ করা। ‘পুরুষরা বেশি ক্ষমতাবান’ এই গতানুগতিক ধারণাকে চুরমার করে ম্যাকিবাকা সামরিক কাজে নারীদের ক্ষমতা ও শক্তির প্রয়োাগ নিশ্চিত করে। তারা কৃষক নারীদের ভিতরে নিজেরা জমির মালিক হবার আকাঙ্খা সৃষ্টি করে এবং নারী শ্রমিকদেরকে কাজে উপযুক্ত পরিবেশের কর্মসূচি দিয়ে তাদেরকে আন্দোলন-সংগ্রামে আকৃষ্ট করে।

উপনিবেশপূর্ব ফিলিপাইনে নারীদের অনেক বেশি অধিকার ও স্বাধীনতা ছিল।  তাদের বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার ছিল এবং তারা দেশীয় জন্মনিয়ন্ত্রণের উপকরণ ব্যবহার করতে পারত। স্পেনীয় উপনিবেশবাদ তাদের সে অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদেরকে আরো পিছনে ঠেলে দেয়। সামন্ত শাসন তাদের ওপরে আরো ভারী বোঝা চাপায়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নারীদেরকে পুরুষের যৌনসামগ্রী ও ভোগ্যবস্তুতে পরিণত করে পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরো মজবুত করে। তাই, ম্যাকিবাকার কাছে নারী নির্যাতন মূল সামাজিক দ্বন্দ্ব থেকে পৃথক নয়। আজকের আধা ঔপনিবেশিক-আধা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই নারী নির্যাতনের কারণ নিহিত। এজন্যে যতদিন না নারীরা দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দেশীয় এজেন্টদের উৎখাত করার বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবে ততদিন তারা ধর্ষিতা ও নির্যাতিতা হতে থাকবে। বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণের এই প্রক্রিয়াই দেশকে নিপীড়ন নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার প্রক্রিয়া।  ফিলিপাইনে নারীরা নিজেদের মুক্তির জন্যে ঐ প্রক্রিয়ার ভিত্তি রচনা করেছে।  রাজনীতিতে অংশগ্রহণ দিয়েই তারা পুরুষ শাসন ও পুরুষ কর্তৃত্বের শৃঙ্খল ভাঙ্গতে পারবে যা তাদেরকে সব জায়গায় আটকে রেখেছে। , নারী হিসেবে তাদেরকে ও কেবল ‘দেশকে নয়’ নিজেদের সবাইকে মুক্ত করার জন্যে লড়তে হবে।

ম্যাকিবাকা মনে করে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষরা সবকিছুর মত আন্দোলন-সংগ্রামেও কর্তৃত্ব করে।  তাই, নারীদেরকে ‘রাজনৈতিক’ করে তোলার জন্যে তাদের সংগ্রামের পৃথক ক্ষেত্র প্রয়োজন।  প্রয়োজন ভিন্ন ফোরামের যেখানে ব্যাপক রাজনৈতিক বিষয়বস্তু মাতৃত্ব, সন্তানপালন ইত্যাদি বিষয় আলোচনা হবে। ম্যাকিবাকা মনে করে পুরুষতন্ত্র বিরোধী সংগ্রামে, সংগ্রামের ভেতরে ও বাইরে, শিক্ষা সংগ্রামের একটি প্রধান অঙ্গ। পুরুষতান্ত্রিক অহমিকাকে আঘাত করেই সচেতনতা তৈরি করতে হবে।  ম্যাকিবাকার একজন নেতা কোনি লেডেসমি (Coni ledesme) বলেন, একটি বাস্তব সমস্যা হ’ল দুঃখজনকভাবে সংগঠনের নিপীড়িত নারীরা এখন পর্যন্ত লজ্জা ও নিরাপত্তার অভাবের দরুন তাৎক্ষণিকভাবে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বেরুতে পারলেই তারা পুরুষ কর্মীদের পুরুষতান্ত্রিক সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

ম্যাকিবাকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা লোরিনা ব্যারোস (Lorina Baros) নতুন নারী’র প্রতিনিধিত্ব করে পুরুষতন্ত্রের বন্ধন ও শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এসে, বিপ্লবের জন্যে জীবনযাপন ও জীবন বিসর্জন দেন।  ’৭০-এ ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কোস দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রী হিসাবে তিনি তাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।  ’৭২-এ সামরিক শাসন জারি হলে তিনি বাধ্য হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান।  এই সময়ে তিনি গ্রেফতার হন।  তিনি যখন কারাগারে তখন তার স্বামী আন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করে।  লোরিনা কারাগার থেকে পালিয়ে এসে তার স্বামীর এলাকার বিপ্লবী দায়িত্ব পালন করেন। এক সময় ফিলিপাইনের রাষ্ট্রীয় বাহিনী (AFP) লোরিনার শেলটার ঘেরাও করলে লোরিনা যুদ্ধ করে শত্রুর অবরোধ ভেঙ্গে সহযোদ্ধাদের পালাবার পথ যখন নিশ্চিত করেন তখনই তিনি শত্রুর হাতে নিহত হন।  তার এই অবিস্মরণীয় ত্যাগ, আপোষহীন সংগ্রামী চেতনা ও দৃঢ় অঙ্গীকার অসংখ্য নারীদের বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে।

সামরিক শাসক মার্কোস ধর্মঘট নিষিদ্ধ করলে ডিস্টিলারি কারখানার নারী শ্রমিকরাই প্রথম এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে।  তারা ‘চার্চ লেবার সেন্টারে’ জমায়েত হয়ে তাদের শোচনীয় অবস্থা সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করে, এবং একদিন প্রকাশ্য দুপুর বেলায় কারখানায় জোর করে ঢুকে পড়ে শ্রমিকদেরকে সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান জানান। এতে ক্ষুব্ধ সরকারের সেনাবাহিনী ঐ নারীদের ঘরবাড়ি তল্লাসী করে গণহারে তাদের গ্রফতার করে।  এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে অনেক স্থানে বেপরোয়া ধর্মঘট পালিত হয়। ফলে সরকার বাধ্য হয় ঐ আইন বাতিল করতে। গড়ে উঠতে থাকে গণমুক্তি বাহিনীর বিশাল আকার।

কিন্তু ’৮০ দশকে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের বিরোধী একটি ধারা দ্রুত বিজয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে নারীদেরকে সামরিক কাজের বাইরে রাখার লাইন নিয়ে আসে। তাদের সে লাইন গৃহীত হলে নারী আন্দোলনের মারাত্মক ক্ষতি হয়। সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নারীদের সাহসিকতা নারী মুক্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।  শহরে সশস্ত্র যুদ্ধ হলে গণতান্ত্রিক নারী সংগঠনগুলোর ভূমিকা যুদ্ধের সহায়তামূলক কাজে রূপান্তরিত হয়।  কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনী আকস্মিক হামলা চালিয়ে বউ-ঝি সহ সন্দেহভাজন বিদ্রোহী নারীদের বন্দী করে। এতে নারী আন্দোলনের গতি স্থবির হয়।  এই সময় উচ্চ আমলাতান্ত্রিক শ্রেণির সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলো সমাজ পরিবর্তনের ধ্বজা ধরে আসে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলো লিঙ্গ ভিত্তিক অর্থাৎ ‘নারী-পুরুষের পার্থক্যকে’ শ্রেণিবহির্ভূত বিষয় হিসাবে গণ্য করে ‘শ্রেণি’ সংজ্ঞার বিকৃতি ঘটায়।  তারা আপোস ও সংস্কারের লক্ষ্যে ‘সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের’ নামে ‘বুর্জোয়া নারীবাদ’কে চালিয়ে দিয়ে বিপ্লবী আন্দোলনের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ায়। ‘নারী সম্প্রদায়ের’ ধুয়ো তুলে ‘শ্রেণি বিভাজনকে’ আড়াল করে। তার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া যায় কোরি এ্যাকুইনোকে একজন নারী ও উদার গণতান্ত্রিক হিসাবে ধরে তার শাসনের প্রথম ছয় মাস তাকে তাদের সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে।  পরে গ্যাবরিয়েলার (GABRIELA) গণতান্ত্রিক নারী ফোরাম ব্যানারে বিপ্লবী নারী আন্দোলন নারী আন্দোলনের প্রতিবিপ্লবী ধারাকে পরাস্ত করে সশস্ত্র সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণের ধারাকে প্রবাহিত করতে সক্ষম হয়।

ম্যাকিবাকা বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগতিার বিরুদ্ধে তার জোরালো প্রতিবাদ সংগঠিত করে এক প্যারালাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।  তারা নারীদেরকে ‘মিস বেকার’ ও ‘মিস দারিদ্র’ খেতাবে ভূষিত করে দ্রুত জনগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয়।  তারা বৈশ্বীকরণের বিনাশ প্রক্রিয়া ২০০০ সালের মধ্যে রামোস সরকারের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি, বহুজাতিক লগিং এ্যান্ড মাইনিং কোম্পানিগুলির স্বার্থে বনভূমি উজাড়কালে সেনাবাহিনীর বোমা নিক্ষেপের বিরোধিতায়, মুক্ত বাণিজ্যিক এলাকায় যৌনপীড়ন, কুমারীত্ব পরীক্ষা, কাজের শর্তের বিরুদ্ধে ধর্মঘট পালন এবং APEC গঠনের গণপ্রতিরোধ, মিছিল ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতেও সাহসী ভূমিকা রেখেছে।

ফিলিপাইনে যে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজিবাদ দীর্ঘদিন জনগণকে শোষণের জোয়ালে বেঁধে রেখেছে তা উৎখাতের যে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে ম্যাকিবাকার আন্দোলন তার এক অখ- অংশ। ম্যাকিবাকা মনে করে, এই সংগ্রাম কেবল পুরুষদের নয় বরং অনেক বেশি নারীদের।  কারণ তারাই ঐ ব্যবস্থা দ্বারা বেশি শোষিত ও নির্যাতিত এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ বেয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামো ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে তারাই বেশি লাভবান হবে।  এই হিসাবে অন্যান্য আন্দোলনের সাথে পার্থক্য ও সমন্বয় সৃষ্টি করে ম্যাকিবাকা তাদের নির্দিষ্ট দাবি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারা সফলতার সাথে বিপ্লবী কর্মসূচিতে নারী প্রশ্ন স্থাপন করতে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে বিপ্লবী সচেতনতা একটি সাধারণ মাত্রায় উন্নীত করতে পেরেছে।

সূত্র: লাল সংবাদ

আপলোডেড বাই: অরণ্য সৌরভ

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close