আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
জাতীয়স্লাইড

প্রশিক্ষণে আগ্রহ নেই চালকদের

ওমেনআই ডেস্ক:  আনোয়ার হোসেন পাঁচ বছর আগে ছিলেন বাস চালকের সহকারী। ওই সময় চালকের কাছেই তার বাস চালনায় হাতেখড়ি হয়। এখন তিনি ঢাকা-সিলেট রুটে বাস চালান। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও ‘গাড়ি ভালোই চালান’ বলে তার ধারণা।

আনোয়ার হোসেনের মত দেশের অধিকাংশ চালকই প্রশিক্ষণে আগ্রহী নন। অথচ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে অদক্ষ চালকদের দিকেই অভিযোগের আঙুল তোলা হয় সবচেয়ে বেশি।

দেশে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতার হিসাবে, দেশে ১২ থেকে ১৫ লাখ চালকের দরকার। কিন্তু প্রশিক্ষিত চালকের অভাবে তারা অদক্ষদের হাতে গাড়ি তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রশিক্ষণ নিতে চালকদের অনাগ্রহের বিষয়টি স্বীকার করে তারা এজন্য সচেতনতার অভাব, আইন না মানার প্রবণতা আর যে কোনো সমস্যায় পড়লে টাকা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন।

অন্যদিকে বিআরটিসির প্রশিক্ষণকেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রশিক্ষণ ছাড়াই ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ থাকায় এ ব্যাপারে চালকদের আগ্রহ কম।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, “চালক যখন সহজে পাওয়া যাবে তখন কেউ ভালো চালাতে না পারলে একজন মালিক তাকে বদলি করতে পারবে। সুযোগ থাকলে তো মালিকরা চয়েজ করবে। এখন তো সেই চয়েজ করার জায়গাটা নাই।

তিনি বলেন, দেশে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে হালকা যানবাহন চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। দক্ষ চালক তৈরির প্রতিষ্ঠান সেই অর্থে কম।

আর সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সেখানে যারা প্রশিক্ষণ নিতে যান, তাদের আগ্রহ থাকে মূলত হালকা যানবাহনের দিকে। দূরপাল্লার যানবাহনের চালকরা প্রশিক্ষণ নিতে যান একেবারেই কম।

সাড়ে তিন টন পর্যন্ত ওজন নিতে পারে এমন যানবাহনকে হালকা, সাত টন পর্যন্ত মাঝারি এবং সাত টনের বেশি ওজন নিতে সক্ষম যানবাহনকে ভারী যান হিসেবে গণ্য করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

একজন চালক শুরুতে হালকা যানের লাইসেন্সের আবেদন করেন। এই লাইসেন্স পাওয়ার তিন বছর পর মাঝারি যানের আর মাঝারি যানের লাইসেন্স পাওয়ার তিন বছর পর ভারী যান চালনার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন।

প্রশিক্ষণের চিত্র
বিআরটিএ চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত সময়ে ৩৫ লাখ ৮২ হাজার ৪৬০টি যানবাহনের নিবন্ধন দিয়েছে। অন্যদিকে সারাদেশে বৈধ লাইসেন্সধারী চালক আছে ১৯ লাখ ৪০ হাজার ৩৮১ জন। এর অর্থ দাঁড়ায় দেশের অর্ধেক গাড়ি যারা চালাচ্ছেন লাইসেন্সবিহীন চালকরা।

আবার লাইসেন্স পাওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা না থাকায় এ বিষয়ে চালকদের তাগিদও নেই। ১৯৭৫ সালে গাজীপুরে প্রথম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট চালুর মধ্যে দিয়ে চালকদের প্রশিক্ষণের সূচনা করা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

ঢাকার তেজগাঁও এবং গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় দুটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আছে বিআরটিসির। এছাড়া ১৬টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যানবাহন চালানোর প্রশিক্ষণ দেয় রাষ্ট্রীয় এ সংস্থা।

সংস্থার সবগুলো ইনস্টিটিউট ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বছরে মোট ২২ হাজার ৪০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ২০১৭ সালে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সব মিলিয়ে ৮ হাজার ৪৫০ জন।

সূচনালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত বিআরটিসি থেকে এক লাখ ২৯ হাজার ১৫৯ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এর মধ্যে গাজীপুরের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ৭২ হাজার ১৯ জন, তেজগাঁও ইনস্টিটিউট থেকে ২২ হাজার ৯১৬ জন এবং টুঙ্গীপাড়া ইনস্টিটিউট থেকে ৮৮৪ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

এছাড়া চট্টগ্রামের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ছয় হাজার ২০৪, বগুড়ায় দুই হাজার ৯০৬, খুলনায় চার হাজার ৯৩৪, নারায়ণগঞ্জে নয় হাজার ৩০, কুমিল্লায় এক হাজার ৪০৫, নরসিংদীতে দুই হাজার ২৩১, পাবনায় ৬৪৫, সিলেটে এক হাজার ৫২১, মিরপুরে ৮৭৫, উথলীতে এক হাজার ৭৭, দিনাজপুরে ৫৯৫, বরিশালে এক হাজার ২১, যশোরে ৩০২ এবং সোনাপুর থেকে ৫৯৪ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। জোয়ারসাহারা এবং ঝিনাইদহে কেউ প্রশিক্ষণ নেননি।

বিআরটিসির গাজীপুর ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের উপ-মহাব্যবস্থাপক ফাতেমা বেগম বলেন, “আমাদের কেন্দ্রগুলো তো সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু সাধারণ লোকজন এখানে তেমন একটা আসতে চায় না। এই মুহূর্তে আমার এখানে বেসিক ড্রাইভিং কোর্সে ৬০০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এর মধ্যে হালকা যানের ৩০০ জন। ১০০ জনকে ভারি যান চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও আছে আট জন।”

এ সমস্যা সমাধানে বিআরটিএ থেকে লাইসেন্স দেওয়া বা নবায়ন করার সময় প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
“আপনি হালকা থেকে মাঝারি, মাঝারি থেকে ভারি লাইসেন্স করবেন সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি একটা প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে এই ট্রেনিংটা নিয়ে আসতে হবে। প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলে লাইসেন্স ইস্যু করা হবে।”

লাইসেন্স নেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ না লাগলেও ২০১৭ সাল থেকে লাইসেন্স নবায়নের সময় চালকদের দুই দিনের একটি রিফ্রেশমেন্ট কোর্স করা বাধ্যতামূলক করেছে বিআরটিএ। এ প্রশিক্ষণের সময় সড়ক নিরাপত্তা, ট্রাফিক আইনসহ বিভিন্ন বিষয়ে চালকদের শেখানো হয়।

সারাদেশে ৯৮টি বেসরকারি মোটর ড্রাইভিং স্কুলের অনুমোদন দিয়েছে বিআরটিএ। এর মধ্যে ঢাকায় ৫৫টি, ঢাকার বাইরে ৪৩টি ট্রেনিং স্কুল আছে। এসব স্কুলে মূলত হালকা যান চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

দক্ষ চালক তৈরির জন্য কিশোরগঞ্জের কালিয়াচাপড়ায় নিটল-টাটা মটরস ড্রাইভার ট্রেনিং স্কুল করেছে নিটল গ্রুপ। ২০১১ সালে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত ছয় হাজার ৫২১ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্কুলের অধ্যক্ষ অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম আলী জিহাদ।

তিনি বলেন, “গাড়ি চালানোর ছয়টি কোর্সে প্রতি মাসে পাঁচ থেকে ছয়শ জনকে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন তারা। কিন্তু ছাত্র কম। বর্তমানে আমাদের এখানে ১২৯ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।”

প্রশিক্ষণে চালকদের অনীহার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম দুদু বলেন, অসচেতনতা, অলসতা আর আইনের ফাঁক থাকায় তারা প্রশিক্ষণ নিতে চায় না।

তবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন তিনি।

“আমাদের চালকরা অলস। আরেকটা ব্যাপার হল লেখাপড়া না জানার কারণে তারা সেখানে যেতে চায় না। আরেকটা কারণ হল তারা যেখানেই ঠেকে যায়, কিছু টাকা খরচ করলে বেঁচে যেতে পারে। এই যে কিছু খরচ করলে বাঁচতে পারে, এইটাই আমাদের ডুবিয়েছে।

“কিন্তু এরাই যখন বিদেশে যায় তখন কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক কষ্ট করে সব শর্ত পূরণ করেই ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে আসে। আমাদের এখানে ঢিলেঢালা ভাব।”

তবে দেশে এখনও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে না ওঠায় ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে প্রশিক্ষণে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন বিআরটিএর পরিচালক (সড়ক নিরাপত্তা) মাহবুব-ই-রব্বানী।

“এ ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরির আগে আমাদের সে ধরনের অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। অবকাঠামো তৈরির আগে এটা করলে আরও ক্রাইসিস তৈরি হবে। ড্রাইভিং ট্রেনিংয়ের জন্য দেশে যা অবকাঠামো আছে তা অনেক অপ্রতুল। আর ভারী যানবাহনের ট্রেনিং দেওয়ার মতো সে ধরনের স্পট নাই।”

দেশের সব জেলায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র করতে বিআরটিএ কাজ করছে বলে জানান মাহবুব-ই-রব্বানী। এটা করা হলে বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেতে পারে বলে জানান তিনি।

কেন দরকার প্রশিক্ষণ
বিআরটিসির পরিচালক (কারিগরী) কর্নেল মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, শুধু গাড়ি চালাতে জানা মানেই প্রশিক্ষিত চালক নয়, পারিপার্শ্বিক আরও অনেক কিছু শেখার আছে।

“একজন চালকের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই, এটা লাগবেই। কারণ রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন, মেকানিজম, ট্রাফিক সিস্টেম, রোডস বিহেভিয়ার-প্যাটার্ন, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা- এসব বিষয় শিখতে হয়।

“চালক যদি প্রশিক্ষণ না নেয় তাহলে সে বুঝবে না সড়কে চলতে হলে কি কি আইনকানুন মানতে হয়, যাত্রীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হবে। গাড়ির যে স্পেসিফিকেশন, বেসিক মেকানিজম আছে সেগুলোও চালককে শেখানো হয়। মূল কথা তাকে একজন দক্ষ, শৃঙ্খল চালক হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

“প্রশিক্ষণকেন্দ্রে এসব বিষয় একটা আন্তর্জাতিক নিয়ম এবং মানদণ্ড অনুযায়ী শেখানো হয়। এসব পদ্ধতিগত বিষয় একটা প্রতিষ্ঠানে না গেলে শেখা যাবে না।”

ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার সময় প্রশিক্ষণের গুরুত্ব না থাকলেও বিভিন্ন চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় প্রশিক্ষণ গুরুত্ব পায় বলে জানান গাজীপুর ইনস্টিটিউটের উপ-মহাব্যবস্থাপক ফাতেমা বেগম। তিনি বলেন, যেসব চালক বিদেশে যেতে চান তাদের জন্য বেশ কাজে আসে প্রশিক্ষণ।

“বিভিন্ন ডেলিগেট আমাদের এখানে এসে যখন দেখেন বিআরটিসি থেকে তার (চালক) সার্টিফিকেট আছে তখন তারা ধরেই নেন চালক প্রশিক্ষিত। তখন তাকে অগ্রাধিকার দেয়। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চালক হিসেবে যোগ দেওয়ার সময়ও প্রশিক্ষণটা গুরুত্ব পায়, যদিও বাধ্যতামূলক নয়।”

বিআরটিসির প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে দুই সপ্তাহ থেকে শুরু করে আট সপ্তাহ মেয়াদী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। হালকা গাড়ির জন্য চার সপ্তাহ মেয়াদী বেসিক ড্রাইভিং কোর্সের জন্য খরচ করতে হয় ছয় হাজার টাকা। ভারী যানের জন্য নয় হাজার টাকায় আট সপ্তাহের বেসিক ড্রাইভিং কোর্স রয়েছে।

হালকা থেকে মাঝারি যানের চালকে উন্নীত হওয়ার জন্য দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ নিতে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। আর মাঝারি থেকে ভারি যান চালানোর দক্ষতা অর্জনের জন্য চার সপ্তাহ মেয়াদী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে খরচ হয় সাড়ে চার হাজার টাকা।

এছাড়া দুই সপ্তাহ মেয়াদে মোটরসাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ দেয় বিআরটিসি। এজন্য সাড়ে তিন হাজার টাকা ফি দিতে হয়।
নিটল টাটা মটরস ড্রাইভার ট্রেনিং স্কুলেও ছয়টি কোর্সে পনের থেকে ৪৫ দিন মেয়াদী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখানে প্রশিক্ষণ ফি দিতে হয় তিন হাজার থেকে নয় হাজার টাকা পর্যন্ত।

সোর্স: বিডিনিউজ২৪.কম

আপলোডেড বাই: সোহেল

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close