আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
উন্নয়নে নারী

স্বাবলম্বী হচ্ছেন রাজশাহীর নারীরা

ওমেনআই ডেস্ক: রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের সুফিয়া খাতুন। স্বামী-সংসার কী, তা বুঝে উঠার আগেই ১৯৮৩ সালে ৫ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বাল্যবিয়ে হয় তার। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় স্বামী তালাক দেন তাকে। এতে ভেঙে না পড়ে আইনের আশ্রয় নেন সুফিয়া। তবে সুবিচার পাননি। এরপর তার আশ্রয় হয় বাবার বাড়িতে। এ সময় সুফিয়া সিদ্ধান্ত নেন নিজ এলাকায় কিছু করার। এরপর একটি বেসরকারী সংস্থার প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০০১ সালে গড়ে তোলেন শিমুল মহিলা উন্নয়ন সমিতি। মাত্র দুই হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে গড়ে তোলা হয় সমিতিটি। এই সমিতির মাধ্যমে কাজ করা হয় হস্তশিল্পের। ছোট পরিসরে এই কাজ শুরু করলেও এখন তা অনেক ছড়িয়ে পড়েছে। মৌগাছি ২৫টি পাড়ার ৫০০জন নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন সুফিয়া।

এ বিষয়ে সুফিয়া খাতুন বলেন, আমরা ঘরে বসে থাকলে তো আমাদের উন্নয়ন সম্ভব না। নিজেদের কাজের সুযোগ পেতে হবে, কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অন্যের জন্যে কিছু করার মানসিকতা থেকে এ সমিতি গড়ে তুলি। এখানে সেলাই, ব্লক বাটিক, চুমকির কাজ, খেঁজুর পাতার পাটি ও নকশী কাঁথার কাজ করা হয়। সমিতির সদস্যদের এ কাজের চাহিদা অনেক বেশি।

তিনি জানান, তার বাৎসরিক আয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। সবার দোয়াই এভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান তিনি, নারীদের উন্নয়নে রাখতে চান অবদান।

শুধু সুফিয়া খাতুন নন, রাজশাহীতে তার মতো অন্তত আরো প্রায় শতাধিক এমন সফল নারী রয়েছেন। এরমধ্যে রাজশাহীর চারঘাটের সরদহ ও ভায়ালক্ষীপুর এবং মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি, জাহানাবাদ, বাকশিমহল, ধোরইল ইউনিয়নে মোট ৪০জন সফল নারী রয়েছে। যারা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্য নারীদেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, সেই নারীদের পবিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা।

রাজশাহী মহানগরীর সংগ্রামী নারী আফিয়া বেগম। থাকেন উপশহর এলাকায়। রাস্তারপাশে বছরজুড়ে পিঠা তৈরি করে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। শীতের মৌসুমে ভাপা পিঠা আর তেলের পিঠা এবং গ্রীষ্মেও মৌসুমে চিতাই পিঠা বানিয়ে চলে তার পাঁচ সদস্যের সংখ্যা। আফিয়া বেগমের দেশের বাড়ি নীলফামারী থানার পার্বতীপুরে। বাল্যকালে বিয়ে হলেও বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় স্বামী মাহাচানকে হারান আফিয়া। এ সময় তার জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। তবে সে হাল ছাড়েননি। স্বামীর রেখে যাওয়া দুই সন্তানকে নিয়ে সংসারের হাল ধরেন। এখন কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে তার জীবনে, ভালোভাবেই চলছে তার জীবন। তবে সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।

রাজশাহীর সংগ্রামী আরেক নারীর নাম ঝর্না বেগম। তার জীবনের রয়েছে ভিন্ন গল্প। কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় পরিচয় আতিকুর রহমানের সাথে। তারপর সেই সম্পর্ক গড়ায় বিবাহ বন্ধনে। কিন্তু পারিবারিক বিভিন্ন টানাপড়েনে তা দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। নিজের রাগের কাছে হেরে গিয়ে তিন বছরের মেয়ে মহিমাকে সাথে নিয়ে চলে যান মায়ের বাড়ি। এরপর শুরু হয় তার অনন্য জীবন। তবে বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে ঝর্না বেগম।

সংগ্রামী নারী ঝর্না বেগম জানান, ভুঁইয়া মার্কেটের এক টেইলার্সে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। সেখানে প্রায় দেড় বছর কাজ করেন। কিন্তু বিনিময়ে সেখান থেকে কোনো পারিশ্রমিক মেলেনি। এরপর আরেক টেইলার্সে দিন ১০০ টাকার বিনিময়ে কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেখানেও ভাগ্য সহায় হয় না। টেইলার্স মালিকের স্ত্রী সন্দেহের চোখে পড়েন ঝর্না। ফলে ১৩ দিনের মধ্যে কাজটি হারান। এরপর ২০০৬ সালে তিনি প্রায় ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নগরীর আর.ডি.এ মার্কেটে নিজস্ব টেইলার্স দেন। মাসিক ৭০০ টাকার বিনিময়ে একটি দোকান ঘর ভাড়া নেন। আর একটিমাত্র সেলাই মেশিনেই প্রথমটা শুরু। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ছোট্ট পরিসরের টেইলার্স এখন বড় পরিসরে রুপান্তরিত হয়েছে।
মোহনপুরের মৌগাছির সুফিয়া, উপশহরের আফিয়া এবং নগরীর ঝর্না বেগমের মতো আরো শতশত রাজশাহীর নারী জীবন সংগ্রামে জয়ী হচ্ছেন। নিজেরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন, পাশাপাশি অন্যদের পরিবারে স্বচ্ছলতা আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছেন। আর নারীদের এমন আত্মপ্রত্যায় ও জীবন সংগ্রাম দেখে নারীদের উন্নয়নে এগিয়ে এসেছে বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি সংস্থা। সংস্থাগুলো নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে উৎসাহ-অনুপ্রেরণার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছে।

সফল উদ্যোক্তা ও নারী উদ্যোক্তা সংগঠন ওয়েবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লিপি আখতার বলেন, ১৯৯৬ সালে রাজশাহীতে প্রথম ব্যবসা শুরু করি। স্কুলে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় হস্তশিল্প ও ফুড প্রসেসিং এর কাজ শিখি। এরপর নিজের প্রতিষ্ঠান লিনা ফ্যাশান হাউজ প্রতিষ্ঠা করি। নারীদের উন্নয়নে কাজ করার মানসিকতা থেকে ওয়েব প্রতিষ্ঠা করি। নিজের প্রতিষ্ঠানে এখন ৩৭জন কর্মী আছে। আর ওয়েবে আছে প্রায় আড়াইশ নারী উদ্যোক্তা রয়েছে। যারা হস্তশিল্প, ফুড প্রসেসিং, আইটিসহ আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে কাজ করছে। তিনি আরো জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে যে হস্ত ও কুটির শিল্প মেলা হয়, সেগুলোতে তার সংগঠনের উদ্যোক্তারা স্টল দেন। নিজেদের হাতে তৈরি করা পণ্য বিক্রয় করেন।

নারীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন রাজশাহী ওমেন চেম্বার অব কর্মাস এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রোজিটি নাজনিন বলেন, রাজশাহীর নারীরা অনেক পিছিয়ে। তবে আশার কথা হলো তারা এগোচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। যে নারীর ভেতরে যে প্রতিভা আছে, তা বিকশিত করার মাধ্যমে নারীদের স্বাবলম্বী করতে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, নারীদের উন্নয়নে রাষ্ট্র, সমাজ ও সরকারকে আরো এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের যে বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন অব্যাহত রয়েছে, তা আরো বাড়ানো ও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রাজশাহীর জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সাহানাজ বেগম জানান, তার কার্যালয়ের অধীনে রাজশাহীতে প্রতি বছর ২০০ জন নারীকে পাঁচটি ক্যাগাগরিতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। তিন মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণে ৫০জন নারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। তার কার্যালয় থেকে যে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেগুলো হচ্ছে আধুনিক দর্জি বিজ্ঞান ও এমব্রয়ডারী, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, খাদ্যদব্র প্রক্রিয়াজতকরণ এবং কাগজের ঠোঙ্গা তৈরি।

সাহানাজ বেগম আরো জানান, এ প্রশিক্ষণে নারীদের আগ্রহী করতে ভাতাও প্রদান করা হয়। এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজশাহীর নারীরা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন।

নানা বাধা-প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছেন রাজশাহীর নারীরা। তাদের এই ধারবাহিকতা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে রাজশাহীর নারীরা আগামীতে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করবে-এমনটি আশা করেন সবাই।

আপলোডেড বাই: অরণ্য সৌরভ

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close