আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আপন ভুবন

ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

ওমেনআই  ডেস্ক: খুব ছোটবেলায় নানীর কাছে শিখেছিলাম ‘লেখাপড়া করে যে চিরসুখী হয় সে, লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।’ তখনো স্কুলে ভর্তি হয় নি, প্রস্তুতি চলছে মাত্র। বয়স যখন ৪ বছর ৬ মাস, তখন একদিন মায়ের সাথে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হলাম। খালাতো বোনের সাথে একসাথেই স্কুলে যেতাম। ছোটবেলায় পড়ালেখায় খুব অমনোযোগী ছিলাম। খেলায় মন ছিল বেশি। খেলায় মেতে থাকতাম সবসময়।তার মধ্যে পুতুল খেলা ছিল অন্যতম। ধর্মীয় অনুশাসনের বেড়াজালে ঘেরা ছিল বাড়ির পরিবেশ। পুতুল খেলা বৈধ ছিল না সেখানে।

নানু বাড়িটা ছিল সাধারন মুসলিম পরিবারের মতো। চরম গর্হিত কোন কাজ ছাড়া মোটামুটি সব করা যেত। আমার শৈশবের অনেকটা সময় কেটেছে সেখানে। নানু ও দাদু বাড়ির প্রথম সন্তান ছিলাম আমি। তাই আদর ভালোবাসার মাত্রাও ছিল বেশি। হাসি আনন্দে চলছিল আমার পড়ালেখা।ভালোই কাটছিল আমার শৈশব। ধর্মীয় আবহের মধ্যে বেড়ে উঠলেও মনটা কেন জানি কখনোই নির্দিষ্ট কোন বাধা মেনে চলতে চায় নি। এজন্য অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে ছোটবেলা থেকেই।

দাদু ছিলেন মাদ্রাসার প্রভাষক। নাম, যশ-খ্যাতি ছিল প্রচন্ড। সবাই একনামে চিনতো। উনার ইচ্ছে ছিল আমাকে মাদ্রাসায় পড়ানো। কিন্তু আমি পড়তে চাই নি। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেয়া হলো। আরবি পারতাম না; খুব কষ্ট হতো বুঝতে। আরবি সাহিত্য ও আরবি ব্যাকরণ কিছুতেই মাথায় ঢুকতো না। খুব কম নাম্বার পেতাম আরবিতে। কতবার মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে আসতে চেয়েছি পারি নি। সেই থেকেই পড়ালেখা নিয়ে সংগ্রাম শুরু।

পাঁচ বছর কেটে গেলো।শিক্ষকদের প্রিয় হয়ে উঠলাম। কিন্তু পড়ালেখাকে ভালোবাসতে পারলাম না মোটেই। সবসময় মনে হতো কখন বের হবো এই কারাগার থেকে। এস এস সি পরীক্ষা হয়ে গেলো। সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আর কারো কথা শুনবো না। কলেজে ভর্তি আমি হবোই।শিক্ষকদের কথা, পরিবারের সবার কথা অমান্য করে ভর্তি হলাম কলেজে। মনে হলো স্বপ্ন দেখছি। শুরুটা ভালোই ছিল। কিন্তু বিপরীত ছিল আমার ভাগ্য। বাঁধা আসতে লাগলো চারদিক থেকে। পড়ালেখা এই বুঝি থেমে যায়!

কলেজের প্রথম বর্ষ। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই আমার বিয়ে হয়ে গেলো। আমি সামলাতে পারলাম না। ভেঙ্গে পড়লাম টুকরো টুকরো হয়ে। অনেকটা সময় লেগে গেলো উঠে দাঁড়াতে। আমার বর চাইতো না আমি লেখাপড়া করি। প্রচন্ড মানসিক চাপে চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসতে পারলাম না। অসুস্হ হয়ে গেলাম। আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরলো। ভয় পেতে শুরু করলাম। মনে হতো আমি আর কোন দিন পড়ালেখা শেষ করতে পারবো না।

কষ্টে অভিমানে কতবার ভেবেছি পড়ালেখা ছেড়ে দেবো। যার সহযোগীতা সবচেয়ে বেশি দরকার ছিলো সেই আমাকে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করতো। সংসারে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। পড়ার জন্য মন কাঁদতে থাকলো। আবার পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। ভয় আর উৎকন্ঠার ভিতর দিয়ে পরীক্ষা শেষ করলাম। আমাকে বলা হয়েছিলো ‘এটাই তোমার শেষ পরীক্ষা। আর পড়তে পারবে না।’

নিভৃতচারী হয়ে গেলাম। দুঃচিন্তা আর মানসিক অশান্তি আমার সুখ-শান্তি সব কেড়ে নিলো। উপহার দিলো তীব্র মাইগ্রেন। কখনো মনে হতো মরে যায়, কখনো টিকে থাকার স্বপ্ন। অসীম সম্ভাবনাময় একটা মেধাবী জীবন ধীরে ধীরে শেষ হতে লাগলো। মনের খুব গহীনে স্বপ্নটাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা করে গেলাম।

বিয়ের পাঁচ বছর কেটে গেলো। যুদ্ধ,সংগ্রাম আর স্বপ্ন নিয়ে।দৃঢ় করলাম নিজেকে। ভর্তি হলাম স্নাতকে। গর্ভে সন্তান এলো। সেই অনুভূতিও অনুভব করার সৌভাগ্য আমার হলো না। মনে হতো আমার সাথেই আরো একটা জীবন নষ্ট হতে যাচ্ছে। সন্তান এলো। সংসার, সন্তান, পড়ালেখা, মানসিক চাপ—সব কেমন গোলমেলে হয়ে যেতে লাগলো। মিটমিট করে জ্বলে থাকা স্বপ্নটাকে আশার শেষ প্রদীপ হিসেবে জ্বালিয়ে রাখলাম।

সব বাঁধা উপেক্ষা করে চালাতে লাগলাম পড়ালেখা। স্নাতক শেষ হলো। মাস্টার্সে ভর্তি হলাম।তার ঠিক কিছু দিন পরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এম বি এ করার সুযোগ আসলো। মনের সংকীর্ণতা কেটে গেলো। নিজেকে প্রতিবাদী করে তৈরী করলাম। কোন বাঁধা যেন আমাকে বিচলিত করতে না পারে তার জন্য নিজের ইচ্ছাকে, নিজের স্বপ্নকে আকাশের মতো বড় করে তুললাম। পড়ালেখা কে ভালবেসে নতুন গতিতে এগিয়ে চলতে লাগলাম। এক আলোর সন্ধানে।

লেখক: হেনা মনি, এমবিএ শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আপলোডেড বাই: সোহেল

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close