আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
উন্নয়নে নারী

পারভীন আসলে নিজের পায়েই দাঁড়াতে চান…

ওমেনআই ডেস্ক: খুব যন্ত্রণা। রাতে ঘুমাতে পারি না। যন্ত্রণায় যন্ত্রণায় রাতের আঁধার কেটে ভোরের আলো দেখি প্রায় দিন। আরো বেশি যন্ত্রণা হলে মাঝে মাঝে বড় ছেলের পিঠে কিল মারতে থাকি। ছেলেও কাঁদে আমি কাঁদি। কখনো দেওয়ালে ঘুষি মারি, কখনো বিছানায় ছটফট করি। তারপরও যদি একটু যন্ত্রণা কমে। এমন যন্ত্রণার কথা বলতে বলতে চোখের জল গড়িয়ে পড়ে পারভীন বেগমের।

পা’টা নিয়ে খুব বিপদে আছি ভাই। আর কিছুদিন পর হয়তো হাঁটতে পারব না। এখন এক পা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটি। চিকিৎসা যে করাব সে সামর্থ্যও নাই। ডাক্তার বলেছে, যত দ্রুত পারা যায় চিকিৎসা করাতে। পায়ের হাড্ডি ক্ষয়ে গেছে। ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে কিন্তু আমি তো নিয়মিত ভাতের টাকাই জোগাড় করতে পারি না, ওষুধ কিনব কীভাবে?

স্বামী মারা গেল বিদ্যুতে পুড়ে। ভাগ্য আমার এতই খারাপ, ডিসের লাইন ঠিক করতে গিয়ে বিদ্যুতের লাইনে পুড়ল। ঘটনা সাত বছর আগের। তখন আমার তিন ছেলেমেয়ে সবাই অনেক ছোট। তারপরও আমি ভেঙে পড়িনি। সংসার চালাতে হবে তাই একাই সংগ্রাম শুরু করি। আর বিয়ে করিনি। জীবনযুদ্ধ মেনে নিয়েছি। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে।

বাপের বাড়ি খুলনা বাগেরহাট। পরিবারে ছিল আমার সৎমা। মায়ের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই সম্পর্ক ভালো না। তাই ছোটবেলা থেকেই মানুষের বাড়িতে কাজ করতাম। ১২ বছর বয়সে পা ভাঙে আমার। তখন এক বাড়িতে কাজ করতাম। পানির কলস নিয়ে টিউবওয়েলে যাই। যেখান থেকে পানি নিয়ে ফেরার পথে পিছলে পড়ি, কলসটাও পড়ে পায়ের ওপর। ভেঙে যায় পা। তারপর অপারেশন করা হয় কিন্তু আর ভালো হলো না পা। আস্তে আস্তে আরো খারাপ হতে লাগল। ভাঙা পা নিয়েই সংসার শুরু করি। বিয়ে হয় আমার। তবুও দুঃখ পিছু ছাড়ে না। পরিবারে প্রচণ্ড অভাব চলতে থাকে। তাই ২০০৩ সালে বাচ্চা নিয়ে চলে আসি ঢাকায়। শুরু করি ভ্যানে সবজি বিক্রি। প্যাডেলে যে পা রাখব সে ক্ষমতাও নেই। তারপরও ভ্যানেই শুরু হয় নতুন জীবনের খোঁজ। অনেক দিন এভাবেই সবজি বিক্রি করেছি কিন্তু ভাঙা পা নিয়ে এভাবে আর সম্ভব হয় না। খুঁজতে থাকি একটি বসার জায়গা।

সংসার ভালোই চলছিল। এরপর স্বামী হারালাম। তিন বাচ্চা নিয়ে শোক কাটিয়ে নেমে গেলাম নতুন করে জীবনযুদ্ধে। যাত্রাবাড়ি মিরাজবাগ খালপাড়া বাজারে কাঁচা সবজি বিক্রি করি। ভাঙা পা নিয়ে সকাল ৫টা থেকেই যুদ্ধ শুরু হয় আমার। কারণ বাচ্চাদের খাবার তো তৈরি করতে হবে। না হলে খাওয়াও হবে না ওদের। মেয়ে মিমের বয়স ১৫, বড় ছেলে সাকিলের বয়স ১২ আর ৮ বছরের ছোট ছেলে হামিমকে নিয়েই আমার সংসার। ওদের জন্যই বাঁচতে চাই। বড় ছেলে সাকিল ক্লাস থ্রিতে পড়ে। চাই না ওর পড়াশোনা বন্ধ হোক।

আমি যেখানে থাকি সেখানে চুলার জন্য সিরিয়াল দিতে হয়। তাই ৫টায় উঠে রান্নার কাজ শেষ করি। এরপর বাড়ির সব কাজ শেষ করে যাই সবজি কিনতে শ্যামবাজার। একটু দেরি করেই সবজি কিনি। তাতে দামে কম পাওয়া যায়। সবজি কিনে চলে আসি খালপাড়ায় আমার দোকানে।

দোকান অবশ্য রাস্তায়। শর্তও অনেক। বেলার ১টার মধ্যে আমাকে দোকান গুটাতে হয়। পুঁজি খুব বেশি নয় ১৫শ’ টাকা। এর মধ্যে আমাকে যা কেনার তা কিনে বিক্রি করতে হয়। সব বিক্রি হলে তবেই লাভ থাকে ২/৩শ’। এভাবেই চলছে আমার দিনপথ।

প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর ব্যথায় ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার বলেছে পায়ের ওপরের দিকের হাড় ক্ষয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে আমি হাঁটতে পারব না। এখন তো আমি খুঁড়িয়ে চলছি এরপর সেটাও সম্ভব হবে না।

পারভীন বেগম বলেন, ডাক্তারের কাছ থেকে শুনেছি মাত্র দুই/আড়াই লাখ টাকা হলেই আমার পা ভালো হবে। কিন্তু আমার তো সামর্থ্য নেই। প্রতিদিন পেটভরে খাবার টাকা জোগাড় করতেই অনেক কষ্ট হয় আমার। এত টাকা পাব কোথায়?

টুলে বসে যখন সবজি বিক্রি করি তখন কত মানুষ কত কথা বলে। কত কটু কথা শুনতে হয়। জীবনের তাগিদে সে কথাও কানে তুলি না। আমি জানি জীবনযুদ্ধ অনেক কঠিন। ভ্যানে সবজি বিক্রি করতাম কিন্তু এই পা নিয়ে চলতে পারি না। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেও পারি না। তাই আশ্রয় নিয়েছি রাস্তাতে।

পারভীন বলেন, আমি সমাজের বিত্তবানদের কাছে সাহায্য চাই। আমি আবার যেন হাঁটতে পারি। আমি যাতে পঙ্গু না হই। সামান্য সাহায্য পেলেই আবারো হাঁটতে পারব। আমি অচল হয়ে গেলে ছোট ছোট বাচ্চাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হবে। না খেয়ে মরতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আমার চাওয়া খুব বেশি নয়। চিকিৎসার সামান্য অর্থ অথবা আমার চিকিৎসার ব্যয়ভার। এই চাওয়া দেশবাসীর কাছে, সমাজের বিত্তবানদের কাছে, সরকারের কাছে। আমি সুস্থ থাকলে হয়তো কখনোই কিছু চাইতাম না। হাত পাততাম না। আমি আগেও কখনো চাইনি। কিন্তু এখন আর পারছি না। তাই আমার আবেদনটুকু রেখে, আমাকে আবারো নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবেন। আমার পরিবারকে বাঁচাবেন। ছোট ছোট বাচ্চাদের যাতে রাস্তায় হাত পাততে না হয়, সে কারণে আমি সবার কাছে সাহায্য চাইছি। আপনাদের সামান্য সাহায্য এবং সহযোগিতায় আমি পারভীন নিজের পায়েই দাঁড়াতে চাই। করুণার পাত্র হতে চাই না কখনো।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: পারভীন বেগম, রুপালী ব্যাংক লিমিটেড, হিসাব নং এসবি ১৯৩২৩, গেন্ডারিয়া শাখা, ঢাকা।

মানবকণ্ঠ/অরণ্য সৌরভ

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close