আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আন্দোলন সংগ্রামে নারী

অগ্নিযুগের বিপ্লবী শান্তি ও সুনীতি

লাবণী মণ্ডল: ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ইতিহাসের প্রত্যেকটি লড়াই-সংগ্রামে নারীর অবদান রয়েছে। আমরা অনেকেই ইতিহাসের লড়াকুদের জানি না, জানতে চাই না। এক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীসমাজ অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছে। আমরা আমাদের পূর্বসূরি স্বজাতির ইতিহাস জানি না বললেই চলে। একটি উদাহরণ টানছি, ‘ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন’।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে হাজার হাজার বিপ্লবী প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। পরোক্ষভাবেও যুক্ত ছিলেন অসংখ্য সংগ্রামী মানুষ। এই বিপ্লববাদী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শত শত নারীও যুক্ত ছিলেন। এঁদের মধ্যে হাতেগোনা চার-পাঁচজনের নাম ও কিছু কিছু ইতিহাস আমরা জানি। এই অজানার বাইরে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই বললেই চলে। ২০১৪ সাল নাগাদ এতটুকু জানাশোনাই ছিল আমার। কিন্তু এরপরে ‘বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনা’ থেকে ‘শত নারী বিপ্লবী’ নামে একটি বই সংগ্রহ করি। বইটি দেখেই হতবাক হয়েছিলাম যে, ‘শত নারী বিপ্লবী’ এতে কাদের জীবনী রয়েছে? বইটি উল্টিয়ে ভালো করে দেখলাম– সূচিপত্র। ভূমিকা দেখে আরও অবাক হলাম– শত নারীই আমাদের উপমহাদেশের। তার মধ্যে আবার বাঙালি নারীরাই বেশি। যাহোক, শত নারী বইটি পড়ার আগে আমার পূর্বসূরি লড়াকু স্বজাতি সম্পর্কে জ্ঞান খুবই সামান্য ছিল– যা উপরে উল্লেখ করেছি। ইলা মিত্র, প্রীতিলতা, মনোরমা বসু মাসিমা ছাড়াও আরও সাতানব্বই জন নারীকে সামান্য হলেও জানতে পেরেছি। এই বইটির ভূমিকাতে আরও কথা লেখা ছিল যে, পরবর্তীতে এই নারী বিপ্লবীদের জীবনী নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বই প্রকাশ হবে। এখন অপেক্ষায় আছি ‘শত নারী বিপ্লবী’ দ্বিতীয় খণ্ড কখন বের হবে!

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে সমস্ত নারী জীবনবাজি রেখে লড়াই করেছিলেন তাঁদের মধ্যে শান্তি ও সুনীতি অন্যতম। তাঁরা দু’জনই ছিলেন কিশোরী। এই কিশোরীদের পথিকৃৎ ছিলেন– স্বর্ণকুমারী দেবী, সরলা দেবী, আশালতা সেন, সরোজিনী নাইডু, ননী বালা, দুকড়ি বালা, ইন্দুমতি দেবী, লীলা রায় ও সাবিত্রী দেবীসহ আরও অনেকে। শান্তি ও সুনীতি তাঁদের পূর্বসূরিদের যোগ্য সহযোদ্ধা হয়েছিলেন। কিন্তু আমরা কী পেরেছি– শান্তি ও সুনীতির যোগ্য উত্তরসূরি সহযোদ্ধা হতে! ধরে নিলাম বর্তমান সময়ে সরাসরি ব্রিটিশ আমাদের শোষণ-শাসন করছে না, নির্যাতন করছে না, গুলি চালাচ্ছে না, ধর্ষণ করছে না। কিন্তু আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা কি দুধে ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে গেছে? হয়তো রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের সাথে সাথে লড়াই-সংগ্রামের পদ্ধতি পাল্টিয়েছে, কিন্তু শাসন-শোষণ, নির্যাতন তো আর বন্ধ হয়নি। যেহেতু শাসন-শোষণ, নির্যাতন বন্ধ হয়নি, সেহেতু শোষণমুক্তির সংগ্রাম, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, মানুষের সংগ্রাম উবে যায়নি। সেখানে আমাদের বিশেষ করে নারীর সংগ্রামী ভূমিকা কই!

বর্তমান সমাজব্যবস্থায় নারীরা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সচ্ছল হলেও চেতনাগতভাবে তারা রয়েছে বহুগুণে পিছিয়ে। পৃথিবীর কোনো ইতিহাসই তারা আজ আর আয়ত্ত করতে চায় না, প্রয়োজন মনে করে না। নিজেদের সংকীর্ণ করতে করতে এমন জায়গায় নিয়ে এসেছে যে, স্বামী-সন্তান, স্বর্ণ, গহনা, একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট হলেই জীবন ধন্য। এর চেয়ে এ জীবনে আর কী চাই! এযেন নারীর আর বেশি ‘নারী’ হয়ে উঠার রাস্তা পাকাপোক্ত করা। নারীবাদী আন্দোলন-সংগ্রামও কেন যেন মানুষের শোষণমুক্তির, সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারছে না। যদিও এক্ষেত্রে পুঁজিবাদের প্রভাব রয়েছে।

শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী
আজ থেকে ৮৫ বছর আগের কথা। ১৯৩১ সাল। শান্তি ও সুনীতি দু’জনই স্কুল পড়ুয়া ছাত্রী। বয়স ১৪-এর ঘরে। তাঁরা দু’জনই স্কুলে সাধারণ ছাত্রীদের মধ্যে ‘ছাত্রীসংঘ’ গড়ে তোলেন। যে সংগঠনের অধিনায়কত্ব করেন– সুনীতি চৌধুরী। এই ছাত্রীসংঘ থেকেই সুনীতিরা লাঠি চালানো, ছোরা চালানো, সাঁতার শিখেন। ক্রমশ শান্তি এবং সুনীতি এ কাজে দক্ষতা লাভ করেন। তাঁদের এই দক্ষতা দলের নেতাদের চিন্তার জগতে উল্লম্বন ঘটায়। স্বপ্ন জন্মে শান্তি ও সুনীতিকে নিয়ে।

স্টিভেন্সকে গুলি করে হত্যা করার দায়িত্বটি পড়েছিল– শান্তি ও সুনীতির উপর। সেদিন ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৩১ সাল। সকাল ১০টা। স্বাভাবিকভাবেই চলছিল শহরের সমস্ত কাজ। কোথাও কোনো হট্টগোল ছিল না। দু’জন তেজোদীপ্ত বিপ্লবী। শান্তি, সুনীতির বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে ১২ ডিসেম্বর। স্কুলে অনুষ্ঠান আছে বলে শাড়ি পরে চাদর জড়িয়ে ছদ্মবেশে বের হয়েছিল বাড়ি থেকে। চাদরের নিচে রাখা ছিল স্টিভেন্সকে গুলি করে হত্যা করার রিভলবার। শান্তি .৪৫ ক্যালিবারের রিভলবার এবং সুনীতি .২২ ক্যালিবারের রিভলবার সঙ্গে নিয়েছিলেন পরিকল্পনাযায়ী। স্টিভেন্সের বাংলোতে ঢোকার কৌশল হিসেবে ছিল– কুমিল্লার সাঁতার প্রদর্শনীর একটি অনুমতিপত্র। সাঁতার প্রদর্শনীর অনুমতিপত্র দেখিয়ে বিনা বাধায় তাঁরা প্রবেশ করলেন স্টিভেন্সের রুমে।

শান্তি
১৯১৬ সালের ২২ নভেম্বর শান্তি ঘোষ কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। বরিশালে ছিল ওঁনাদের আদি বাড়ি। তাঁর ছোটোবেলা কেটেছে কুমিল্লায়। পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ কুমিল্লা কলেজের প্রফেসর। মায়ের নাম সলিলাবালা ঘোষ। ১৯৩০ সাল। দেশ জুড়ে চলছে আইন অমান্য আন্দোলন। দলে দলে মানুষ পথে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভে সামিল হন। অকুতোভয় যুবসমাজ। প্রশাসনের অত্যাচার শুরু হল। ইংরেজ সরকারের পুলিশ নির্বিচারে অকথ্য নির্যাতন শুরু করল মানুষের উপর। এতে যুবসমাজ আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।
দেশে সেইসময় ঘটে চলেছে বিপ্লবী তরুণ-তরুণীদের নানা দুঃসাহসিক কাণ্ড-কারখানা। সরকারি পদাধিকারী ইংরেজদের উপর আঘাত হানা ও হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটছে। প্রফুল্ল, শান্তি ও আরও অনেকে দলের নেতাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা শুরু করলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, আমরা কেন থেমে থাকব? বারবার ওঁদের কাছে আবেদন জানাতে লাগলেন, আমরা কিছু করতে চাই। আমাদের উপর কিছু ‘কাজ’-এর দায়িত্ব দেয়া হোক। এই সময় দল সিদ্ধান্ত নেয়, কুমিল্লার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে হত্যা করে ব্রিটিশ সরকারকে চরম আঘাত হানা হবে। শান্তিরা বারবার আবেদন জানাতে থাকে ওই দায়িত্ব তাঁদের দেবার জন্য। শেষ পর্যন্ত শান্তি আর সুনীতির উপর দল দায়িত্ব দিল। দলেরই নির্দেশে প্রফুল্ল থাকবেন বাইরে, তিনি যা করবেন গোপনে করবেন।

সুনীতি
১৯১৭ সালের ২২ মে কুমিল্লার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে সুনীতির জন্ম হয়। ত্রিপুরা জেলার নবীনগর থানার ইব্রাহিমপুর গ্রামে তাঁর পিতৃভূমি। বাবা উমাচরণ চৌধুরী সরকারি চাকরি করতেন। মা সুরসুন্দরীদেবী একজন বিদূষী মহিলা। সুনীতি যখন কুমিল্লার ফৈজন্নেসা গার্লস স্কুলের ছাত্রী তখন তাঁর দুই দাদা বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। ১৯৩২-এর ১৪ ডিসেম্বর সাঁতারের ক্লাব করার অনুমতি নেয়ার অছিলায় তাঁরা মি. স্টিভেন্সের বাংলোয় যান এবং মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গুলি করেন। সুনীতির প্রথম গুলিতেই স্টিভেন্স মারা যান। কিন্তু শান্তি ও সুনীতি ধরা পড়েন। পুলিশ তাঁদের ওপর প্রচণ্ড অত্যাচার চালায়। এ সত্ত্বেও তাঁদের কাছ থেকে গুপ্ত কথা আদায় করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় কুমিল্লা জেলে– সেখান থেকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। বিচারে তাঁদের কিশোরী বয়সের কথা বিবেচনা করে ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

সুনীতির কারাজীবন ছিল এক দীর্ঘ অত্যাচারের কাহিনী। প্রতিহিংসাপরায়ণ বিদেশি সরকার তা যতদূর সম্ভব নিষ্ঠুর ও অসহনীয় করে তুলতে চেয়েছিল। তাঁকে তৃতীয় শ্রেণির কয়েদি করে রাখা হয় এবং অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিদের থেকে তাঁকে আলাদা করে রাখা হয়। তাঁর দুই দাদাকে বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়। পুরো পরিবারকে বছরের পর বছর কাটাতে হয় অনাহারে, অর্ধাহারে। অপুষ্টিতে ভুগে যক্ষ্মা রোগে মারা যায় তাঁর ছোট ভাই। এই অসহনীয় অত্যাচার কিন্তু সুনীতির চরিত্রকে করে তোলে ইস্পাতের মতো দৃঢ় কঠিন।

শান্তি ও সুনীতিকে যখন কুমিল্লা জেলে নিয়ে যাওয়া হল তখন তাঁদের বয়স ছিল মাত্র ১৪। এরপর শান্তি ও সুনীতিকে নিয়ে আসা হয় আলিপুরে সেন্ট্রাল জেলে।

এই কিশোরীদের কোর্টে দেখতে শত শত সাধারণ মানুষ আসতেন। শান্তি ও সুনীতির চোখে ছিল বিদ্রোহের দৃষ্টি। ভয় বলে ওরা কিছু জানত না। ২৭ জানুয়ারি শান্তি ও সুনীতির মামলার রায় হয়েছিল। কিশোরী বলে শান্তি ও সুনীতিকে মৃত্যুদণ্ডের বদলে দেয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।

তথ্যসূত্র: শত নারী বিপ্লবী– সম্পাদক শেখ  রফিক

সূত্র/আপলোডেড বাই: জাগরনীয়া/অরণ্য সৌরভ

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close