আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশ

সিডও দিবস: নারী-বৈষম্যের করুণ চিত্র জাতিসংঘে

cedawlogo-logo-311x186ওমেনঅাই: জাতিসংঘের নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ বা সিডও সনদে স্বাক্ষর করার ৩০ বছর পরেও বাংলাদেশে নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা কমেনি। জাতিসংঘের এক বিশেষ প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ঘরে বা বাইরে প্রতিনিয়ত সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে থাকেন বাংলাদেশের নারীরা। আর সহিংসতার অন্যতম কারণই হচ্ছে নারী ও পুরুষের মধ্যকার অসমতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা।

বাংলাদেশের নারীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে এই মূল্যায়ন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনের নারীর প্রতি সহিংসতাসংক্রান্ত বিশেষ প্রতিনিধি বা স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার রাশিদা মঞ্জুর। আর এই প্রতিবেদনটি রাশিদা মঞ্জু গত এপ্রিলে জাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তরে জমা দিয়েছেন। এরপর এটি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ২৬তম অধিবেশনে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে নানা ধরনের উদ্বেগজনক তথ্য দেওয়া হয়েছে।

রাশিদা মঞ্জু প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য গত বছরের ২০ থেকে ২৯ মে পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে ছিলেন। প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের সদর দপ্তর থেকে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে সরকারের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতিসংঘকে নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করতে বাংলাদেশ যেসব কাজ করছে, তার বিবরণ দিয়ে বলেছে, নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

রাশিদা মঞ্জু বলেছেন, বাংলাদেশে নারীরা পরিবারেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হন। ২০১৩ সালের প্রথম আট মাসে যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতনের ৩২৭টি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১১০ জনকে হত্যা করা হয়, নয়জন আত্মহত্যা করেন আর ২০৮ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এখানে নারীর প্রতি সহিংসতার বড় হাতিয়ার হচ্ছে অ্যাসিড নিক্ষেপ ও ধর্ষণ। ২০১৩ সালের প্রথম আট মাসে ২২ জন নারী অ্যাসিড নিক্ষেপের শিকার হন। অন্যদিকে একই সময়ে ধর্ষণের ৬৬১টি ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যায়। এর মধ্যে গণধর্ষণের ঘটনা ছিল ১৮৮টি। এসব ঘটনায় ৪৯ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল, আর পাঁচজন নারী ঘটনার পর আত্মহত্যা করেছিলেন।

রাশিদা মঞ্জু বলেছেন, গ্রাম্য সালিসের নামেও নারীকে নির্যাতন করা হয়, ফতোয়া দেওয়া হয়। অনেক নারীই সহিংসতার বিচার চাইতে প্রথাগত সালিসব্যবস্থায় যান। কিন্তু তা নারীকে আরও বেশি সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়। ফতোয়া দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার পর অনেক নারীর আত্মহত্যা করার ঘটনাও রয়েছে। আর হিন্দু দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। নারী হওয়ার পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটে।

বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করা হলেও বাংলাদেশে এখনো এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। গ্রামে অধিকাংশ পরিবার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য হয় ধর্ষণ থেকে রক্ষা করতে। এ ক্ষেত্রে ভুয়া জন্মসনদ ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনে সরকার গত দুই দশকে বেশ কিছু আইন, নীতিমালা ও কর্মসূচি নিলেও নারী প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। অনেক আইন করলেও সচেতনতার অভাব, রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং প্রতিকার পেতে নারীর বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা রয়েছে। যৌতুকবিরোধী আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নেই। আক্রান্ত নারী ও তাঁর পরিবারের প্রতি হুমকি এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক প্রমাণের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। একটি অভিযোগ নথিভুক্ত করতেও পুলিশকে ঘুষ দিতে হয়, নয়তো রাজনৈতিক নেতৃত্বের শরণাপন্ন হতে হয়। আবার পুলিশ ও ডাক্তারের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, অপরাধীর প্রভাব, সম্পদ ও শক্তি সহিংসতার শিকার নারীর তুলনায় অনেকাংশে বেশি থাকায় তা পুলিশের ওপর এবং তদন্তে প্রভাব ফেলে। যৌন সহিংসতার তদন্ত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিকভাবে নারীরা যে বৈষম্যের শিকার, তার বড় উদাহরণ ঘরে, খামারে, পারিবারিক ব্যবসার ক্ষেত্রে কাজ করলেও তাঁদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। শ্রম আইন থাকলেও নারীরা এর সুফল পান না। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের যৌন হয়রানি রোধে ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট একটি নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত এই নীতিমালা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে আইনের খসড়া তৈরি হলেও গত তিন বছরে এর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

জাতিসংঘ সিডও কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমা খান গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘সরকারের করা জরিপে নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহতা প্রকাশ পেয়েছে, তার ৫০ শতাংশ হয়তো আমরা ধারণা করতাম। সে তুলনায় রাশিদা মঞ্জু নির্যাতনের যে তথ্য দিয়েছেন, বলতে গেলে তিনি কমই বলেছেন। আর জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি যখন এ ধরনের প্রতিবেদন দেন, তিনি সেই দেশটির সরকারের জরিপ ও বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবহার করেই দেন।

প্রতিবেদনের সবশেষ অংশে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার সংস্কার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতাবৃদ্ধি এবং একটি স্বাধীন জাতীয় নারী কমিশন প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সিডও সনদের ২ ও ১৬.১ অনুচ্ছেদের বিষয়ে বাংলাদেশের জানিয়ে আসা আপত্তি তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাশিদা মঞ্জু। বিয়ে, বিচ্ছেদসহ, সম্পত্তির মালিকানার ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনের বাইরে একটি অভিন্ন সাধারণ আইন তৈরির প্রস্তাব আছে সনদের এই দুই ধারায়।

ঢাকা, ৩ সেপ্টম্বর (ওমেনঅাই)/এস এল/

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close