আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সাক্ষাৎকার / ব্যক্তিত্ব

আপাদমস্তক এক শিল্পী লুবনা মারিয়াম

নূর কামরুন নাহার:

লুবনা মারিয়াম বাংলাদেশের স্বনামধন্য এক নৃত্য শিল্পী । আপাদমস্তক এই শিল্পী সম্প্রতি পেয়েছেন প্রথম বিশ্বরতœ ভুপেন হাজারিকা আর্ন্তজাতিক সংহতি পুরষ্কার। তার সংস্কৃতের ওপর অসামান্য দখল ও পান্ডিত্য, নৃত্য নিয়ে নিরলস কাজ, রবীন্দ্র চর্চা, বাংলাদেশের লোকনৃত্যকে আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে পরিচিত করানো এবং বহুমুখি কাজই তাকে এনে দিয়েছে সন্মানজনক এ পুরষ্কার ।

জন্ম, শৈশব কৈশর

১৯৫৪ সালের ৮ জুলাই পাকিস্তানের বালুচি¯’ানের কুয়েটায় জন্ম তার। বাবা কাজি নুরুজ্জামান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সাত নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার। মা ড: সুলতানা সারওয়াৎ আরা জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অ্যামিরেটাস। ২০০৮ সালে যিনি অর্জন করেন সন্মানজনক বেগম রোকেয়া পদক।
পিতা নুরুজ্জামানের বাঙলাপ্রীতিই তাদের পরিবারকে নিয়ে আসে বাংলাদেশ অথাৎ তৎকালীন পূর্বপাকি¯’ানে। সিদ্ধেশ্ররীসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভাড়া বাড়িতে কাটে তার শৈশব। ১৯৬০ সনে মাত্র ছয় বছর বয়সে নাচ শিখতে ভর্তি হন বুলবুল ললিতকলাতে । তারপর থেকে সেটাই যেন হয়ে পড়ে স্বপ্ন আর বাস্তবতা। ৬৭ নাচের ওপর সার্টিফিকেট অর্জন করেন। কিš‘ বাফার সাথে ওতপ্রেতভাবে জড়িত থাকেন ৭২ সাল পর্যন্ত। তার নিজের ভাষায়“ বাফার সাথে কাটানো ঐ সময়টা ছিলো জীবনের সবচেয়ে মধুর ও আনন্দের। এতো বেশি ও সময়টাতে বাফার সাথে নিজেকে সম্পৃত্ত রেখেছিলাম যে বাবা বলতেন বাড়িতে আর না আসলেই হয়। ”

কৈশরেই তিনি দেখেন উত্তাল এক সময় জাতিসত্তার লড়াইয়ে আত্মপ্রত্যয়ী বাঙালির জেগে ওঠা আর সেই সাথে অপূর্ব এক সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ। তখন বড় সংগঠনের মধ্যে বাফা, ছায়ানট উল্লেখযোগ্য ছিলো। জাগো আর্ট ছিলো। ছোট ছোট সংগঠন ছিলো তারা সংস্কৃতিচর্চা করতো। এর বাইরেও মেনন ও মতিয়া গ্রুপের ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায়শ মঞ্চ ¯’াপন করে সঙ্গীত এবং নৃত্য অনুষ্ঠান আয়োজন করতো। সারা দেশেই এরকম নানা অনুষ্ঠান হতো। এ সকল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংস্কৃতি চর্চাটা ব্যাপক ভাবে বিদ্যমান ছিলো। এবং তা ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সংস্কৃতি চর্চাই ছিলো রাজনীতি। রাজনীতির মূল লক্ষ্যই ছিলো আমার বাঙালি সংস্কৃতি আমি প্রতিষ্ঠিত করবো।
অধ্যয়ন আর নৃত্য
হলিক্রশ স্কুলেই শুরু হয় তার পড়াশোনা । ১৯৬৯ সালে এস.এস.সি পাশ করেন এ স্কুল থেকেই। তারপর হলিক্রশ কলেজ থেকে ১৯৭১ সালে এইচ এস সি।
মেধাবী মারিয়াম বুয়েটে পড়াশোনা করেছিলেন ¯’াপত্যকলার ওপর কিš‘ শিল্পী সত্তা তাকে তাকে তৃষ্ণার্ত করে তোলে শিল্প আর সৌন্দর্যের গভীরতম রহস্য উন্মোচনে-
“ নাট্য শাস্ত্র, শিল্পশাস্ত্র উপনিষদ গুলো মূল সংস্কৃত ভাষায় পড়ার ই”ছা থেকেই আমার সংস্কৃত শেখা। মনের ভেতর প্রশ্ন ছিল, ‘এত বছর আমি কি করলাম?’ আমার সারা জীবনের কাজটা কি? এটা বুঝতে গিয়েই শিল্প শাস্ত্র আর নৃত্যশাস্ত্র নিয়ে পড়লাম। শিল্প নিয়ে যে সব দার্শনিক চিন্তা এই উপমহাদেশে করা হয়েছে, সেইগুলোতে আমার আগ্রহ ছিল – নাট্যশাস্ত্র, রসশাস্ত্র ইত্যাদি”।
১৯৯৭-৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ভারতে সংস্কৃত বিষয়ে পড়াশোনা করেন মারিয়াম। ২০০০ সালে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী থেকে অর্জন করেন সার্টিফিকেট কোর্স ইন সংস্কৃত । ২০০৩ সালে ভারতের মধ্যপ্রদেশের হারি সিং গর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর অফ আর্ট প্রোগ্রাম ইন সংস্কৃত এবং দুবছর কেরালায় কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতের ওপর মাস্টার্সে পড়াশোনা করেন। কিন্ত লুবনা মারিয়ামের মূল আগ্রহ নৃত্য।

কর্ম, জ্ঞান আর সৃষ্টির ভুবন
৬/৭ বছর বয়স থেকেই মঞ্চে কাজ করা শুরু । বাফার সাথে ওতপ্রেতভাবে যুক্ত ছিলাম ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। ‘৭৩ সাল থেকে শুরু করেন সতন্ত্রভাবে কাজ করা।
৭২ থেকে ‘৮২ সন পর্যন্ত প্রতি বছর, কলকাতায় বিশ্বভারতী আশ্রমিক সংঘের সাথে অনেক কাজ করেছেন। পরিচিত হয়েছেন বিশ্বভারতীয় রবীন্দ্র নৃত্যের সাথে । গায়িকা কনিকা বন্দোপাদ্যায়,নীলিমা সেন গান করেছেন তার সাথে তিনি নৃত্য করেছেন । পুর্ণিমা, জিতেন্দ্র সিং এদর সান্নিধ্য লাভ করেছেন । রবীন্দ্র শিল্প চর্চার নান্দনিকতা বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন হৃদয় দিয়ে। কোলকাতায় ভানুসিংহের পদাবলীতে রাধা করেছেন যা তার জীবনের একটা উলেখযোগ্য অর্জন।

শান্তিবালা সিনহার কাছে তিনি শিখেছেন মনিপুরি নাচ। ‘৮৪ থেকে কর্পরেট অফিসে যোগ দেওয়াতে নাচ থেকে একটু সরে আসতে হলো । সে সময় মেয়ে আনুশেহ্ আনাদিল বড় হতে থাকলো। ওকে গান শেখানোর জন্য ওস্তাদ সাগীরউদ্দিন খানকে কলকাতা থেকে আমন্ত্রণ করে আনতে শুরু করেন। অনেকেই তার কাছে গান শিখতে আরম্ভ করলেন। শাহীন সামাদ, ডালিয়া নওশিন, ইফফাত আরা দেওয়ান, খায়রুল আনাম শাকীল, এবং অনেকেই শিখেছিলেন।
৯১ এর দিকে সাধনা শুরু করেন। এটি একটি ট্রাষ্ট। নায়লা খান (মারিয়ামের বড় বোন এবং শিশু বিশেষজ্ঞ) রুবানা হক (ব্যবসায়ি/উপ¯’াপক আনিসুল হকের স্ত্রী), সালাউদ্দিন আহমেদ এবং সাদাফ সাজ (সদ্য প্রয়াত জামাল নজরুল ইসলামের কণ্যা)। আলিমুর-রহমান খান, তিনি নিজেও একজন সংঙ্গীতজ্ঞ ও সেতার বাদক, সাধনার সভাপতি। লুবনা দায়িত্ব নেন সাধারণ সম্পাদকের।
প্রাথমিক দিকে সাধনার লক্ষ্য ছিল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে নতুন প্রজন্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। সঙ্গীতে পন্ডিত অজয় চক্রবর্তী, পন্ডিত যশোরাজ, আমানাত আলী খান, ইমরাত খান, রাশিদ খান, এবং নৃত্যে লীলা স্যামসন, মাধবী মুড্গাল, ভারতী শিবাজী, আলারমেল ওয়াল্লী, প্রেরণা শ্রীমালি ইত্যাদি এমন অনেক বড় বড় গুণি শিল্পীকে আনেন। সাধনা থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি নাচের অনুষ্ঠান প্রযোজনা শুরু করা হয়। শুধু অনুষ্ঠান আয়োজন করবেন না নিজেরা কিছু করবেন এ ভাবনা থেকেই থেকে প্রযোজনার শুরু।
ভারতে পড়াশোনা করে ফিরে এসে দেখেন নাচ নিয়ে অনেক কাজ বাকি। তখন ‘ভানুসিংহের পদাবলী’, ‘বাদল বরিষণে’ মতো নৃত্যনাট্য প্রযোজনা করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘চন্ডালিকা’ ‘হে অনন্ত পূর্ণ’ ‘তাসের দেশ’ ‘মায়ের খেলা’ সাধনা থেকে প্রযোজনা করেন। ঘটনাক্রমে সেই সময় পরিচিত হোন সাইমন জাকারিয়ার সাথে। এ পরিচয় তার জীবনের আর একটা টানিং পয়েন্ট। মূলত শাস্ত্রীয় নাচ আর রবীন্দ্র চর্চাই ছিলো লুবনার মূল লক্ষ্য। কিš‘ সাইমনের প্রেরণায় দেখেন লোকনৃত্য। বাংলাদেশের বহু গ্রামে যান। সেখানে দেখেন পদ্মার নাচন, মনসার নাচ, লাঠিখেলা জারিগান। এগুলো দেখে অভিভূত হোন। সে মুগ্ধতা থেকেই বাংলাদেশের লোকনৃত্য নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন।
২০১০ থেকে শুরু করেছেন পারফরমিং আর্টের স্কুল কল্পতরু। এ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন তিনি
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বাংলাদেশের লোক গীত, নৃত্য নন্দনতত্ত্ব, লোকনৃত্য, সংস্কৃত , পারফরমেন্স, কালচারাল স্টাডিজ এবং নানাবিধ বিষয়ে দেশে বিদেশে অসংখ্য পেপার উপ¯’াপন করেন।লিখেছেন আন্তজাতিক বিভিন্ন জার্নাালে গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রবন্ধ । নাচ নিয়ে বৃটিশ কাউন্সিল, গ্যাটে ইন্সটিটিউট, আমেরিকান সেন্টারের সাথে কাজ করছেন। কোরিয়াতে গোয়াংজু নামে একটা জায়গা ¯’াপন করা হ”েছ। সেটাকে কোরিয়ার সরকার এশিয়ার সাংস্কৃতিক রাজধানি হিসাবে পরিকল্পনা করেছেন। তাদের সাথে মনসা নিয়ে একটা গবেষণার কাজ করছেন। লাঠি খেলা বা বায়বেশে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তার কর্মজীবনের এক উল্লেখযোগ্য বিষয় নেপালের চর্যা নৃত্য আবিষ্কার। চর্যা নৃত্য মূলতঃ বজ্রযান বৌদ্ধ তান্ত্রিক কৃত্যে ব্যবহৃত নৃত্য-গীতির ধারা। চর্যা শুদ্ধ নৃত্য বা নাটক নয়। তান্ত্রিকেরা এই নৃত্যের মাধ্যমে ধ্যানস্ত হন। যে সকল দেবতার নৃত্য চর্যানৃত্যে পরিবেশিত হয় তারা হলেন – বজ্রযোগিনী (বজ্রবারাহী), মহামঞ্জুশ্রি, পঞ্চবুদ্ধ (বৌদ্ধ দর্শনের পঞ্চ স্কন্ধের প্রতীক)।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নির্দশন চর্যাপদের ভাষা নিয়ে নানান মত আছে। আসামে বলা হয় এটি প্রাচিন অহমিয় বা অসমিয় ভাষা, মিহিলার বিদ্বানরা বলেন এটা প্রাচীন মৈথিলী ভাষা, উড়িয়ারা বলে এটি উড়িয়ার প্রাচীন ভাষা।হতে পারে এ বিশাল ভূখন্ডে তখন এটাই ভাষা ছিলো কালের বিবর্তনে নানা ভাষায় রুপ নিয়েছে। কিš‘ তার আগ্রহ ভাষার বিশ্লেষণে ছিল না। নেপালে গিয়ে তিনি দেখলেন নেওয়ার সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা বৌদ্ধ – নেওয়ার বৌদ্ধ মহাজানিদের মধ্যে বজ্রজান বৌদ্ধধর্ম পালিত হয়। বজ্রজানিরা তান্ত্রিক সাধন মার্গে বিশ্বাসী। তাদের মধ্যে পুরোহিতদের বলা হয় বজ্রাচার্য। বজ্রাচার্যরা কিছূ ভীষণ গোপন তান্ত্রিক কৃত্য পালন করেন। সে কৃত্যর মধ্যে তারা যে নৃত্য করেন সেটাই চর্যা নৃত্য।
রায়বেশে বা লাঠিখেলা পুনপ্রতিষ্ঠা করাও লুবনা মারিয়াম তার কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে মনে করেন। ১৮০৬ সনে রাম রামবসুর লেখা ‘রাজা প্রতাপাদিত্যচরিৎ’, যেটাকে বলা হয় বাংলা ভাষায় প্রেসে ছাপা প্রথম বই। এটি র্ফোট উইলিয়াম কলেজের প্রেস কর্তৃক প্রকাশিত। সেটাতে উল্লেখ আছে প্রতাপাদিত্যের ৫২,০০০ রায়বেশে ছিলো, যারা সৈনিক ছিলো। বাশের কারসাজি দিয়ে যারা দেশ রক্ষা করতো। তাদেরকে রায়বেশে এবং তাদের কলা বা এই লাঠিখেলাকেও রায়বেশে বলা হতো। এ কলা এবং সমর কৌশল বাংলার নিজস্ব। বর্তমানে গ্রামে গঞ্জে লাঠিখেলাগুলো বিভিন্ন নামে পরিচিত। গত শতাব্দীতে গুরু সদয় দত্ত, একজন আই সি এস অফিসার, ইংল্যান্ডে গিয়ে বৃটিশ লোকনৃত্য দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। দেশে ফিরে এসে বাংলার লোকনৃত্য গুলো সংগঠিত করে ব্রতচারী আন্দোলন আরম্ভ করলেন। রায়বেশে নৃত্যটা তিনি বীরভূমে পেয়েছিলেন । রায়বেশে ব্রতচারীর মধ্যে সংরক্ষিত ছিল। মেদেনীপুরে তরুন প্রধান ব্রতচারি আন্দোলনের সাথে যুক্ত। তাকে তিনি আমন্ত্রণ জানান। সংরক্ষিত রায়বেশে ও বাংলাদেশের জিবন্ত লাঠিখেলা চর্চাকে সেটা একসাথে করে পুন:প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তার সংগঠন ত্রিশটি লাঠি খেলা দলের সাথে যুক্ত। অন্তত পাঁচটি কর্মশালা করিয়ে ছয়শ-সাতশত জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সার্ক ফোকলোর সিম্পোজিয়ামে উপ¯’াপনা করেছেন। তাদের প্রশিক্ষিত রায়বেশে দলকে বিদেশে পাঠানো হ”েছ। প্রশিক্ষিতরা শিল্পকলা একাডেমীতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করেছে। নেত্রকোনাতে ও নড়াইলে মেয়েদের দল করেছেন। ওরাও বেশ ভালো করছে । এটি এখন স্বীকৃত যে এটা বাংলার নিজস্ব কলা । নারীবাদী নৃত্যও মারিয়ামের একটি ভিন্নমাত্রার সংযোজন। তার মতে- ”মঞ্চে আমরা যাই তা পৌরণিক গল্প বা রবীন্দ্র- নজরুল নিয়ে। এই যে পঞ্চাশ বছর ধরে মঞ্চে কাজ করছি, আমি যে নারী যে আখ্যানটা তো আমার কাজে ফুটে ওঠেনি। তখন মনে হলো নাচের মধ্যে বাস্তব জীবনকে আনতে হলে যে কোন একটা দর্শন লাগে। তখন আমি নারীবাদের ভিত্তিতে বাস্তব জীবনটা আনবো নাচে”।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close