আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আপন ভুবন

খুব কি দূরের পথ নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ?

primarylogoওমেনআই: এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান জানালেন— বর্তমানে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ৬৫ শতাংশ। তার মানে আরও ৩৫ শতাংশ মানুষের সাক্ষর হতে বাকি। মজার ব্যাপার হল, মাত্র এক বছর আগে ২০১৩ সালে তখনকার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আফছারুল আমীন জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ৭১ শতাংশ। এক বছরে সাক্ষরতা ছয় শতাংশ হারে কমে গেল?

বাস্তবতার নানা ফ্যাক্টর হিসাব করলে কমতেই পারে। সাক্ষরতা সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানোর মতো এমন কোনো দক্ষতা নয় যে একবার অর্জন করলে তা সারাজীবনই থাকবে। প্রকৃতপক্ষে বহু মানুষই প্রথম জীবনে কিছু পড়ালেখার পর সারাজীবন আর পড়ালেখা নিয়ে মাথা ঘামায় না। অনেকে প্রারম্ভিক পড়ালেখার পর চর্চা না করায় শেষ দিকে তা ভুলে যায়। সুতরাং শিক্ষা-প্রক্রিয়ার সঙ্গে অব্যাহতভাবে জড়িয়ে না থাকলে সাক্ষরতার হার বাড়া-কমা স্বাভাবিক ব্যাপার।

কিন্তু আমাদের দেশে বছর বছর সাক্ষরতার হার যেভাবে বাড়ে-কমে, তাতে প্রকৃতপক্ষে কত শতাংশ মানুষ সাক্ষর তা জানাই কঠিন হয়ে পড়ছে। একদিকে যেমন সরকার পরিবর্তনের ফলে সাক্ষরতার হারে পরিবর্তন হয়, তেমনি একই সরকারের আমলে বিভিন্ন বছরেও এ হারে পরিবর্তন দেখা যায়।

আর পরিবর্তনগুলোও এমন যে, একটির সঙ্গে আরেকটির যোগসূত্র অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। সাক্ষরতার হার কখনও বেড়ে যাচ্ছে এক লাফে, কখনও-বা যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই নিচে নেমে যাচ্ছে। এই যেমন, গতবারের চেয়ে এবার সাক্ষরতার হার কমার দৃশ্যত কোনো কারণ নেই; কিন্তু যেহেতু মন্ত্রী জানিয়েছেন, সুতরাং একেই প্রামাণ্য হিসেবে ধরে নিতে হবে।
শিক্ষা-প্রক্রিয়ার সঙ্গে অব্যাহতভাবে জড়িয়ে না থাকলে সাক্ষরতার হার বাড়া-কমা স্বাভাবিক ব্যাপার

শিক্ষা-প্রক্রিয়ার সঙ্গে অব্যাহতভাবে জড়িয়ে না থাকলে সাক্ষরতার হার বাড়া-কমা স্বাভাবিক ব্যাপার

প্রামাণ্য ধরে নেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে আরেক সমস্যা। বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার নির্ণয়ে সর্বশেষ বড় ধরনের খানা জরিপ করেছে বাংলাদেশ সরকারেরই একটি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস বা বিবিএস। তাদের ২০১০ সালের হিসাব অনুসারে সাক্ষরতার হার ছিল ৫৯.৮২ শতাংশ। প্রতি বছর যে সংখ্যক মানুষ সাক্ষর হয়, তাতে বর্তমানে এ হার ৬৫ শতাংশ বা এর কাছাকাছিই হওয়ার কথা। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে উল্লম্ফন হলে তা ৭০-এও পৌঁছুতে পারে। আপত্তি সেখানে নয়, কিন্তু কোন জায়গায় আমরা আছি সেটা তো যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতিতে ঠিক করতে হবে! এ সব ক্ষেত্রে ইচ্ছেমতো সংখ্যা বসানোর তো সুযোগ নেই‍!

সরকারের একাধিক সংস্থা এসব বিষয়ে জরিপ করে। একটির জরিপের ফলাফলের সঙ্গে আরেকটির ফলাফলের ভিন্নতা হয়। কেন? মেথডোলজির কারণে?

অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু জানি, প্রতিটি সংস্থা মোটামুটি একই ধরনের মেথডোলজি অনুসরণ করে। সাক্ষরতা বিষয়ে সব ক’টি খাটাখাটুনি না করে কোনো একটি সংস্থা নিয়মিত বিরতিতে একটি নির্দিষ্ট মেথডোলজি অনুসরণ করে জরিপ করবে— সরকার কি এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না? সে ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির হার অনেকটাই কমানো সম্ভব।

অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থাগুলো সাক্ষরতার যে হিসাব করে তাতে দেখা যায়, বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৫৭-৫৮ শতাংশ। ৮ সেপ্টেম্বরের একটি দৈনিক পত্রিকায় গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গণসাক্ষরতা অভিযান বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে যে সমস্ত বেসরকারি সংস্থা কাজ করে, তাদের একটি বড় নেটওয়ার্ক কোঅর্ডিনেট করে। তাদের মেথডোলজি ও সরকারের মেথডোলজি সবসময় এক রকম হয় না। এ অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একেক সময় একেক ধরনের হিসাব দিচ্ছে। কোনটিকে আমরা প্রামাণ্য ধরে নেব?

জটিলতা রয়েছে সাক্ষরতার তথ্য কীভাবে আনা হয় সে প্রক্রিয়াতেও। সাধারণত এ ধরনের জরিপে দেখা যায়, জরিপকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানতে চান, এই খানার সদস্য কতজন এবং তাদের মধ্যে কতজন লেখাপড়া করতে পারে। একে বলা হয় ‘সেলফ-রিপোর্টেড’ বা স্ব-মূল্যায়িত সাক্ষরতা। সরকারি জরিপকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ এই সেলফ-রিপোর্টেড সাক্ষরতার তথ্য সংগ্রহ করে।

দেখা যায়, যারা নিরক্ষর, তারাও এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় সাক্ষরতার হিসাবে চলে আসে। কেউ তো আর ইচ্ছে করে নিজেকে নিরক্ষর বলতে চায় না! বিশেষ করে যারা প্রথম জীবনে বিদ্যালয়ে গিয়েছিলে, তারা লেখাপড়া ভুলে গেলেও নিজেকে সাক্ষর দাবি করতেই বেশি পছন্দ করেন। তারা সত্যিকার অর্থেই সাক্ষর কি-না এ পরীক্ষা নেওয়া হলে নিশ্চিতভাবেই সাক্ষরতার হার কম হত।

অন্যদিকে সাক্ষরতার সংজ্ঞায় রয়েছে ধোঁয়াশা। সব প্রতিষ্ঠান একইভাবে সাক্ষরতার সংজ্ঞা ব্যবহার করছে না। একসময় শুধু পড়তে ও লিখতে পারাই সাক্ষরতা মনে করা হলেও, এখন এর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় যুক্ত হয়েছে। ইউনেস্কো যে সংজ্ঞা দিচ্ছে তাতে বলা হয়, যে কোনো ভাষায় পড়তে, বুঝতে ও লিখতে পারা এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় গাণিতিক দক্ষতা থাকলেই কেবল একজনকে সাক্ষর বলা যাবে। এখন এই সংজ্ঞানুসারে সাক্ষরতা হিসাব করলে সত্যিকার অর্থেই কতজন সাক্ষর, তা বের করা একটি ভিন্নতর গবেষণার কাজ।

সাক্ষরতা নিয়ে ২০০২ সালে একটা ব্যতিক্রমী কাজ করেছিল এডুকেশন ওয়াচ টিম। তারা ইউনেস্কোর এই সংজ্ঞা ভিত্তি ধরে সাক্ষরতা জরিপ চালিয়েছিল এবং সাক্ষরতাকে তারা চার ভাগে ভাগ করেছিল— অ-সাক্ষর বা নিরক্ষর, প্রাক-সাক্ষর, প্রারম্ভিক স্তরের সাক্ষর ও উচ্চতর স্তরের সাক্ষর।

লেখক: গৌতম রায়, ঢাকা।

ঢাকা, ১৪ সেপ্টম্বর (ওমেনআই)/এসএল/

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close