আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সাক্ষাৎকার / ব্যক্তিত্ব

সুফিয়া কামাল: নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ

sufia-kamal 20.11.14ওমেনআই: বেগম সুফিয়া কামাল। একটি নাম। একটি ইতিহাস। প্রথিতযশা কবি, লেখিকা এবং নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন মানবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এক আপোষহীন নারী। তার কণ্ঠ অন্যায়, দুর্নীতি এবং অমানবিকতার বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার ছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। একজন রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়েও শৃঙ্খল ভেঙেছেন তিনি। নারীদের এনেছেন মুক্ত আলোর সন্ধানে। তিনি বলেছেন :
‘তোমার আকাশে দাও মোর মুক্ত বিচরণ-ভূমি,
শিখাও আমারে গান। গাহিব, শুনিবে শুধু তুমি।
মুক্তপক্ষ-বিহগী তোমার বক্ষেতে বাঁধি নীড়
যাপিবে সকল ক্ষণ স্থির হয়ে, চঞ্চল অধীর।’
[ সূত্র: কবিতা-আমার নিশীথ ]

শোষিত মানুষের সংগ্রামকে তিনি নিজে উপলদ্ধি করেছেন। লড়েছেন অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে। সুফিয়া কামালের কবিতায় তারই চিত্র উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন :
‘এ বাংলার বুকে আজি ফের
তেমনি হত্যার লীলা চলে,
সন্তানের রক্তধারা বাংলা আর সবুজ অঞ্চলে
মুছাইতে পারেনাকো, বয়ে চলে নদী স্রোতধারে
নদী হতে সাগরে সাগরে।
সেই স্রোতধার
নিখিল মানবজনে দেয় উপহার।’
[ সূত্র : একত্রিশে চৈত্র, ১৩৭৭ ]

শুধু কী তাই? দেশের অবহেলিত, নির্যাতিত, শোষিত নারী সমাজের জন্য অন্তরায় অনেক। তাই প্রয়োজন হয় দীর্ঘ সংগ্রামের। তিনি বলেছেন :
‘এ বিপুল বিশ্বারণ্যে লুমুম্বার শোণিত প্রবাহ
ছড়াইল দীপ্তময় পাবক প্রদাহ
জাগরণ! মানবাধিকারবোধ জ্বালা
শহীদের কণ্ঠে বাজে শোণিতাক্ত অপরাজিতার নীলমালা।
আফ্রিকার রাত্রি শেষ। দিগন্তে প্রদীপ্ত সূর্যকর।
অগ্নিবাহু মেলে দিয়ে উদ্ভাসিয়া তুলিছে প্রহর।’
[ সূত্র : লুমুম্বার আফ্রিকা]

আবার সুফিয়া কামাল এই সংগ্রামের বাইরেও নারীদের জন্য চিন্তা করেছেন। খুঁজেছেন নারী জীবনের পরিণতি। এমন কী, প্রকৃতির অকৃপণ সম্পদের প্রকাশ দেখে যখন তিনি মুগ্ধ হন, তখন তাঁর চোখে ভাসে দুটি সত্তার মিলনের স্বপ্ন। তিনি বলেন :
‘সাঙ্গ হলে সব কর্ম, কোলাহল হলে অবসান,
দীপ-নাহি-স্বালা গৃহে এমনি সন্ধ্যায় যেন তোমার আহ্বান
গোধূলি লিখতে আসে। নিঃশব্দ নীরব গানে গানে,
পূরবীর সুরে সুরে অনুভবি তার প্রাণে প্রাণে।
মুক্তি লভে বন্দী আত্মা-সুন্দরের স্বপ্নে, আয়োজনে।
নিঃশ্বাস নিঃশেষ হোক পুষ্প-বিকাশের প্রয়োজন।’
[ সূত্র: সাঁঝের মায়ায় ]

কবি সুফিয়া কামাল দেশকে ভালোবেসেছেন গভীরভাবে। দেশের প্রতি ছিল তাঁর মমত্ববোধ। রচিত কবিতায় সেই ভালোবাসা উঠে এসেছে বারবার। কিবতায় তিনি বলেছেন :
‘‘অনেক কথার গুঞ্জন শুনি
অনেক গানের সুর
সবচেয়ে ভালো লাগে যে আমার
‘মাগো’ ডাক সুমধুর।”
[ সূত্র : কবিতা, জন্মেছি এই দেশে ]

এভাবে তাঁর লেখায় পথ দেখেছেন নারীরা। তাঁর দেখানো পথে আলো ছড়িয়েছে দেশ থেকে সীমানার বাইরে। তাঁর আলোয় আলোকিত হয়েছে দেশ। উপমহাদেশের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী কবীর সুমন নিজের গানে কবি সুফিয়া কামালকে স্মরণ করে গেয়ে ওঠেন :
‘ওই তো লক্ষ ছেলেমেয়ে
নাতিনাতনি দামাল
সবুজ দ্বীপের মতো মাঝখানে
সুফিয়া কামাল।’

২.
সুফিয়া কামালের কবিতায় জীবনের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবের সমাজ জিজ্ঞাসা প্রবল হয়েছে। কর্তব্যবোধের তাড়না তিনি অনুভব করেছেন। পর্দানশিন পরিবারের মেয়ে সন্তান হওয়ার কারণে বাল্যকালে তিনি মুক্তাঙ্গনের কোনো বিদ্যাপীঠে গমন করার সুযোগ পাননি। ঘরের মধ্যেই আরবির পাশাপাশি শিখতে শুরু করেন বাংলাভাষা। আর তখন থেকেই শুরু হয়েছিল কবিতা লেখা ও পড়ার ঝোঁক। এ সম্পর্কে তিনি তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, `এমনি কোনো বর্ষণমুখর দিনে মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা `হেনা` পড়ছিলাম বানান করে। প্রেম, বিরহ, মিলন এসবের মানে কি তখন বুঝি? তবু যে কী ভালো, কী ব্যথা লেগেছিল তা প্রকাশের ভাষা কি আজ আর আছে? গদ্য লেখার সেই নেশা। এরপর প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক মোহগ্রস্ত ভাব এসে মনকে যে কোন অজানা রাজ্যে নিয়ে যেতো। এরপর দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন লিখছেন, বেগম সারা তাইফুর। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হলো ওরা লিখছেন আমিও কি লিখতে পারি না? শুরু হলো লেখা লেখা খেলা। কী গোপনে, কত কুণ্ঠায়, ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা ছড়া গল্প। কিন্তু কোনোটাই কি মনের মতো হয়! কেউ জানবে, কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে দেখে নিজেই শরমে সংকুচিত হয়ে উঠি।`

৩.
সুফিয়া কামাল ১৬টি সংগঠনের সভানেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯২৫ সালে অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধীজি বরিশাল এলে নিজে চরকায় সুতা কেটে গান্ধীজির হাতে তুলে দেন। তিনি ইন্ডিয়ান উইমেন্স ফেডারেশনে প্রথম মুসলিম মহিলা সদস্য মনোনীত হন। বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে তিনি কাজ করেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কলকাতায় লেডি ব্রেবোন কলেজে আশ্রয় কেন্দ্র পরিচালনা করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকায় মহিলাদের সংগঠিত করে মিছিলের আয়োজন ও নেতৃত্বসহ সামগ্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে ওয়ারী মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠা এবং এর প্রথম সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬০ সালে তাঁর নেতৃত্বে ঢাকায় ‘বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত স্মৃতি কমিটি’ গঠন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী নিবাসের নাম ‘রোকেয়া হল’ করার প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ গঠন এবং সভানেত্রীর দায়িত্ব শুরু করেন। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকা শহরেই অবরুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেন। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন কবি ও নেত্রী।

৪.
বেগম সুফিয়া কামালের জন্ম বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদে নানার বাড়িতে ১৯১১ সালের ২০ জুন। পৈতৃক নিবাস ছিল ত্রিপুরা জেলার শিলাউর গ্রমে। মাত্র সাত বছর বয়সে ১৯১৮ সালে কবির বিয়ে হয় সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে। ১৯৩২ সালে নেহাল হোসেন মারা যায়। এরপর তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি চলে তার সাহিত্যচর্চা। ১৯৩৯ সালে সুফিয়া কামাল পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কামালউদ্দীন খানের সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি ‘সুফিয়া কামাল’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। শুরু হয় নতুন জীবন। বরিশালের মাতৃমঙ্গল সেবাদানের কাজ দিয়ে সুফিয়া কামালের সমাজসেবামূলক কর্মজীবনের শুরু। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সাঁঝের মায়া (১৯৩৮), একাত্তরের ডায়েরী, মোর যাদুদের সমাধি পরে, একালে আমাদের কাল, মায়া কাজল (১৯৫১), কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭) ইত্যাদি। ২০০২ সালে বাংলা একডেমি সুফিয়া কামাল রচনাসমগ্র প্রকাশ করে।
অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন তিনি। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জাতীয় পুরস্কার `তঘমা-ই-ইমতিয়াজ` লাভ করেন। এছাড়া তিনি বাংলা একডেমি পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), উইমেনস ফেডারেশন ফর ওয়ার্ল্ড পিস ক্রেস্ট (১৯৯৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭) লাভ করেন।

বিংশ শতাব্দীর বাংলার নারী জাগরণ এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের বিচিত্র ইতিহাসের সঙ্গে কবি সুফিয়া কামালের নাম নিবিড়ভাবে জড়িত। সময়ের দাবিতে ব্যক্তিগত জীবনের মতো তিনি স্বপ্ন দেখতেন সবুজ পৃথিবীর। ৮৯ বছর বয়সে ২০০০ সালের ২০ নভেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তার মৃত্যুদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

ঢাকা, ২০ নভেম্বর (ওমেনআই)/এসএল/

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close