আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
মতামতস্পট লাইট

ঢাকায় বৃদ্ধ-প্রতিবন্ধী-শিশুদের জায়গা নেই!

footover 23.11.14লাবণ্য হক::ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে রাস্তা পারাপার বাধ্যতামূলক করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। শনিবার ডিএমপির ঘোষণা অনুযায়ী, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে হাত উঠিয়ে গাড়ি থামিলে যারা রাস্তা পারাপার করেন তাদের শায়েস্তা করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত নামানো হবে। এই আদালত অকুস্থলে দোষীকে ২০০ টাকা জরিমানা অথবা সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড দিতে পারবেন। আগামী ২৫ নভেম্বর থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত আদালত পরিচালনা করা হবে।

অবশ্য ডিএমপির এমন মিলিটারি কমান্ড এটাই প্রথম নয়। এর আগে ২০১০ সালের ১ নভেম্বর থেকে রাস্তা পারাপারকারী ‘অপরাধীদের’ ২৪ ঘণ্টার জেল দেয়ার বিধান জারি করে। সে সময় এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। কিন্তু তারপরও সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেনি ডিএমপি।

এমন কঠোর নির্দেশেও সাধারণ জনগণ সাড়া না দেয়ায় এবার স্বাধীন পথচারীদের আরো কঠোর হয়েছে মহানগর পুলিশ। এবার শায়েস্তা করতে রাস্তায় রীতিমতো আদালত নামিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

কিন্তু বাস্তব চিত্রটা অন্যরকম যা ডিএমপি অস্বীকার বা উপক্ষা করছে। বৃদ্ধ, নারী, শিশু, শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং মালামাল নিয়ে যারা হেঁটে চলাচল করেন তাদের জন্য ওভারব্রিজের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা কতো সম্ভব তারা তা ভেবে দেখেননি।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) হিসাবে, রাজধানী ঢাকার ৬০ শতাংশ মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করেন। যানজট কমাতে, পরিবহনের ওপর চাপ কমাতে পথচারীদের প্রাধান্য দিয়ে নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দে চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে না।

ওভারব্রিজ ব্যবহারের জন্য জবরদস্তি করা হচ্ছে অথচ রাজধানীর ওভারব্রিজগুলোর কতোটা ব্যবহার উপযোগী তা দেখার কেউ নেই। অনেক ওভারব্রিজই জরাজীর্ণ নোংরা, মাদকসেবী ও যৌনকর্মীদের আশ্রয়স্থল আর ছিনতাইকারীদের দখলে। নাক চেপে, পকেট সামলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কে ওভারব্রিজে উঠতে যাবে!

অপরদিকে পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই ওভারব্রিজের বদলে জেব্রাক্রসিং ও আন্ডারপাসের ওপর জোর দেয়া হয়। মানুষ স্বচ্ছন্দে রাস্তা পারাপার হয়। সেসব দেশে তো বাংলাদেশের মতো মানুষ গাড়িচাপা পড়ে না! এই জবরদস্তির সিদ্ধান্তে শুধু নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বেপরোয়া গাড়ি চলাচলকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে না তো! ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরো উন্নত ও জনগণকে সচেতন করার বদলে এমন অগণতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা আরোপ করা এই শহরের কর্মজীবী মানুষেরা সহজভাবে নেবে না।

এছাড়া ঢাকা শহরে বিভিন্নভাবে পথচারীদের চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। ফুটপাতে দোকান, গাড়ি সারানো, ওয়েলডিং কারখানা, রাস্তার মাঝখানে লোহার গ্রিল, প্রাইভেটকার পার্কিং করে ফুটপাত দখল, স্থাপনার জিনিসপত্র ও ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা, ফুটপাত সংকুচিত করা, বাড়ি ও দোকানে গাড়ি ঢোকাতে ফুটপাতে কিছুক্ষণ পরপর কেটে নিচু করাসহ বিভিন্নভাবে মানুষের হাঁটাপথ দখল হয়ে যাচ্ছে। এভাবে হাঁটার মতো একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছে।

ডিএমপি প্রকৃতপক্ষেই জেব্রাক্রসিংয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কারণ এর সংখ্যার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগে নেই। ডিসিসিতেও নেই। ‘জেড’ আকৃতির জেব্রাক্রসিং আর চোখে পড়ে না। কিছু জায়গায় সাদা মার্কিং দেয়া ক্রসিং আছে।

এর চেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো, অধিকাংশ চালকই জানেন না এই মার্কিংয়ের মানে কী? অথচ এ চিহ্নের ওপর দিয়ে লোকজন পার হলে গাড়িকে অবশ্যই থেমে যেতে হবে।

কিন্তু পুলিশ বলছে, বেশিরবাগ স্থানেই ওভারব্রিজ আছে। মানুষ সেসব ব্যবহার করছে না। জেব্রাক্রসিংয়ের মার্কিং করার দায়িত্ব ডিসিসির। কিন্তু নতুন রাস্তা করলে মার্কিং করে পরে রঙ উঠে গেলে আর খোঁজখবর রাখে না ডিসিসি। অথচ বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত নিরাপদ সড়ক পারাপার ব্যবস্থা জেব্রাক্রসিং। গাড়িচালকদের এ বিষয়ে সম্যক ধারণা দেওয়া এবং পথচারীদের জেব্রাক্রসিংয়ে রাস্তা পারাপারের ব্যাপারে সচেতন করলে কমবে রাস্তা পারাপারজনিত দুর্ঘটনা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো শহরের রাস্তা পারাপার ব্যাবস্থায় অবশ্যই তিনটি ব্যবস্থা থাকতে হবে: ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ও জেব্রাক্রসিং। কারণ বৃদ্ধ, শিশু ও পঙ্গু লোকদের পক্ষে ফুটওভারব্রিজ দিয়ে পার হওয়া প্রায় অসম্ভব। এছাড়া যারা মালপত্র নিয়ে হেঁটে চলাচল করেন তাদের জন্য ওভারব্রিজ ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

তাই রাস্তা পারাপারের ব্যাপারে এই জবরদস্তির নিয়ম করার আগে এই মানুষগুলোর কথা ডিএমপির ভাবা উচিৎ ছিল।

লেখক: সাংবাদিক

ঢাকা, ২৩ নভেম্বর (ওমেনআই)/এসএল/

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close