আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
নারী সংগঠন

বাল্যবিয়ে রোধ কর, নারী নির্যাতন বন্ধ কর

naripokkho-wmnওমেনআই:নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবসে এবারের শ্লোগান হচ্ছে “বাল্যবিয়ে রোধ কর, নারী নির্যাতন বন্ধ কর”
যুগে যুগে নারীর উপর নানা রূপে, নানা কায়দায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্যাতন হয়ে আসছে। এরই একটি ভয়াবহ রূপ হলো বাল্য বিয়ে। বাল্য বিয়ের মাধ্যমে নারীকে শারিরীক ও মানসিকভাবে তৈরি হবার আগেই অপরিণত বয়সে যৌন সম্পর্ক, গর্ভধারণ এবং পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য করা হয়, যা নারীর জীবনকে করে তোলে দুর্বিসহ ও ভয়াবহ।

নারীর উপর সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ১৯৮১ সালে ল্যাটিন আমেরিকান নারীদের সম্মেলনে ‘২৫ নভেম্বর’কে ‘নারী নির্যাতনের বিররুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে এ দিবসটি স্বীকৃতি পায়। তখন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালন করা হয়।

নারীপক্ষ ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে তুলে ধরে দিবসটি পালন করে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য “বাল্যবিয়ে রোধ কর, নারী নির্যাতন বন্ধ কর।”

বাল্যবিয়ের অন্তর্নিহিত ধারণা হচ্ছে, নারীকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ও যৌন-সেবাদাসী হিসেবে ব্যবহার করা। এর সাথে আছে সনাতনী চিন্তা, যেমন: মেয়েরা বাবা-মায়ের কাছে অন্যের (স্বামী ও শশুরবাড়ির) গচ্ছিত সম্পদ। মেয়ের প্রতিষ্ঠার অর্থ হচ্ছে একটি বিয়ে; অপরদিকে ছেলের প্রতিষ্ঠার জন্য চাই শিক্ষা-দীক্ষা ও কর্মসংস্থান। ধর্মের অপব্যাখ্যাও এই অপচর্চার জন্য দায়ী। এসবের সাথে যুক্ত হয় দারিদ্রের অজুহাত।

প্রায় একশত বছর আগে নারীকে বাল্যবিয়ের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো, যার ফল “বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন- ১৯২৯”; কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, একশত বছর পরেও বাল্যবিয়ে রোধ তো হয়ইনি বরং এখনো বাল্যবিয়ে বন্ধে আন্দোলন, সমাজ ও পরিবারকে সচেতন করাসহ সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সাথে দেনদরবার করতে হচ্ছে।

আমাদের জাতীয় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদ ও আইনে ১৮ বছরের কম বয়সীরা শিশু হিসেবে গণ্য। ১৮ বছর পূর্ণ না হলে তারা প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে গণ্য হয় না, ভোটাধিকার পায় না, কোন বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হওয়া বা সম্মতি-অসম্মতি প্রদানের আইনি অধিকার পায় না।

১৩ থেকে ১৯ বছরের মেয়ের বিয়ের হার বিশ্বের সর্বোচ্চ এগারোটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে। দেশের বিদ্যমান আইনে বিয়ে নিবন্ধনের ন্যূনতম বয়স নারীর ১৮ বছর ও পুরুষের ২১ বছর, তবে প্রকৃতপক্ষে বিয়ে হচ্ছে অনেক কম বয়সে। আইনী বিধি-বিধান সত্ত্বেও বাল্যবিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না এবং এটি একটি জাতীয় সমস্যা। যদি বিয়ে নিবন্ধনের বয়স আরো কমানো হয় তাহলে শিশুবিয়ে শুরু হবে এবং এই সমস্যা প্রকটতম রূপ নেবে, যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। বাল্যবিয়ের কুফল হচ্ছে, অকাল গর্ভধারণ, অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ, প্রসূতি ও নবজাতকের অসুস্থতা ও মৃত্যুঝুঁকি, অপুষ্ট শিশুর জন্ম, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, অর্থনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া, ইত্যাদি। এছাড়াও, নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে নারী যৌনমিলনে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং সৃষ্টি হয় বহুবিবাহ বা অন্য নারীর প্রতি আসক্তির মতো ঘটনা। এ সবই নারীর স্বাভাবিক জীবন ও শিশুর বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করে। বাল্যবিয়ে শিশুর মানবাধিকার লংঘন, যা স্বাভাবিক উন্নয়ন ব্যাহত করে। নিজের শরীর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা নারীর মৌলিক মানবাধিকার; বাল্য বিয়ে এই মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে।

১০-১৮ বছর বয়সের মেয়েটি হচ্ছে বালিকা ও কিশোরী। এই বয়সে সুপ্ত অপার সম্ভাবনাময় জীবন বিকশিত হয় তার পরিবেশ, সমাজ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে। এই সময়ে তাকে নারী হয়ে জন্মাবার অর্থ উপলব্ধি করতে এবং নিজেকে সে অনুযায়ী গড়তে হয়। মেয়ে হবার কারণে তাকে যে বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয় তা স্বাভাবিক এবং ন্যায়সঙ্গত বলে সে ধীরে ধীরে মেনে নিতে বাধ্য হয়। সমাজ থেকে পাওয়া ধারণা ও বিধিনিষেধ তার চলাফেরা এবং বাইরের জগতের সাথে সম্পর্ক সীমিত করে। যে বয়সে ছেলেরা অবাধ স্বধীনতা পায় সে বয়সে মেয়েদের ঘরের গন্ডির বাইরে যাওয়া প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এমনকি বয়ঃসন্ধিকালে যখন তার জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সহানুভূতি, আশ্রয় এবং নিরাপত্তা তখন তাদের অনেককেই জীবনের ঘটনাবলী- যথা: বিয়ে, যৌতুক, গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদান, সন্তান লালন-পালন, নিজের জীবিকা নির্বাহ, ইত্যাদি মোকাবেলা করতে হয়।

আমাদের সমাজে মেয়েরা শিশুকাল থেকেই প্রতি পদে ‘না’ সূচক নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়, ফলে তার চিন্তা, স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতা ধীরে ধীরে বিনষ্ট হতে থাকে। ঠিক এই সময় বাল্যবিয়ে যেন তার জন্য “মরার উপর খাড়ার ঘা!”

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪ মন্ত্রীসভার বৈঠক থেকে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন- ২০১৪’ এ বিয়ে নিবন্ধনের বয়স কমিয়ে ছেলের ১৮ বছর ও মেয়ের ১৬ বছর করার বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ব্যক্তিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাল্যবিয়ে বন্ধে আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তিসহ বিশ্বের বেশীরভাগ দেশের বিধি-বিধানের সাথে এই উদ্যোগ সাংঘর্ষিক এবং পশ্চাৎপদতার পরিচায়ক।

বিয়ে নিবন্ধনের বয়স আরো কমানো হলে তা আমাদের ছেলে-মেয়েদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যহানিসহ সকল রকম নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে, যা বৃহত্তর অর্থে দেশ ও সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ। সরকারের এই অদূরদর্শী উদ্যোগ এবং অশুভ পায়তারায় আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

বাংলাদেশ নারী উন্নয়নে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের নারীরা যখন হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করে, খেলাধূলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে বিশ্বে রেকর্ড স্থাপন করছে ঠিক সেই সময় বিয়ে নিবন্ধনের বয়স কমানোর সরকারী প্রস্তাব নারী উন্নয়ন তথা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন, বিশেষভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা-অবস্থানকে আরো হুমকির সম্মুখীন করবে। সুতরাং, সরকারের এহেন উদ্যোগ বন্ধ করার আহ্বান জানচ্ছি।

আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি দাবি জানাচ্ছি,

# বাল্যবিয়েজনিত ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মেয়েশিশুকে রক্ষার জন্য বিয়ে, যৗন সম্পর্কসহ জীবনের সকল বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারীর স্বার্থে কার্যকর উদ্যোগ নিন; অন্যথায় দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী নির্যাতনের শিকার হবে এবং গোটা দেশ সঙ্কটে পড়বে
# বাল্যবিয়ে রোধে জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত একীভূত ডাটাবেইজ তৈরী ও তা সর্বস্তরে, সর্বক্ষেত্রে ব্যবহারের মাধ্যমে বিয়ে নিবন্ধনে নারী-পুরুষের প্রকৃত বয়স কার্যকর করুন
#বিয়ে নিবন্ধনের জন্য বয়সের কোন এভিডেভিট সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিন

# বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে সমন্বিত পদক্ষেপ, যেমন: শিক্ষা বৃত্তি, বিভিন্ন প্রচারাভিযান, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ, ইত্যাদি কার্যক্রমকে আরো কার্যকর ও জোরদার করার জন্য জরুরীভাবে উদ্যোগ নিন।

ঢাকা, ২৬ নভেম্বর (ওমেনআই)/এসএল/

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close