আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
শিল্প-সংস্কৃতি

চারুকলায় জয়নুল উৎসব

ZAINULওমেনআই: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সোমবার থেকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্পাচার্যের জন্মশত উদযাপিত হবে। জয়নুল আবেদিনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্মৃতিরক্ষার জন্য বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে সোমবার সকাল সাতটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন শিল্পাচার্যের সমাধিতে পুস্পস্তবক অর্পণ করবে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলা একাডেমি, নজরুল ইন্সটিটিউট ও উদীচীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে সোমবার বিকেল তিনটায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে এই আয়োজনে বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পাচার্যের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন।

এতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করবেন সংস্কৃতি সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস এনডিসি। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করবেন জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সভাপতি চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। স্মারক বক্তৃতা প্রদান করবেন অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। উদ্বোধন পর্ব শেষে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী কক্ষে শুরু হবে জয়নুলের ১০০টি শিল্পকর্ম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী।

এছাড়া শিল্পকলা একাডেমীতেও শুরু হচ্ছে তিনদিনব্যাপী জয়নুল মেলা। এই মেলায় থাকছে চিত্রপ্রদর্শনী, লোক সংগীতানুষ্ঠান ও আর্টক্যাম্প। জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও হাশেম খানের ডিজাইনে পোস্টার মুদ্রণ করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এছাড়া স্মারক ডাক টিকেট প্রকাশের পাশাপাশি স্মারকগ্রন্থ ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে।

অন্যদিকে ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালায় শুরু হবে পাঁচদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। চিত্রপ্রদর্শনী, আলোচনাসভা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা দিয়ে সাজানো হচ্ছে এই অনুষ্ঠানমালা। এই আয়োজনের উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। এছাড়াও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সারাদেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা।

অন্যদিকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। এ উপলক্ষে ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয় আয়োজিত হবে জয়নুল স্মরণ অনুষ্ঠান। উদীচীর কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি কামাল লোহানীর সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে উদীচীর শিল্পী ও কর্মীরা উপস্থিত থাকবেন। শিল্পাচার্যের জীবনের নানা দিক ও তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা ছাড়াও উক্ত অনুষ্ঠানে জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্ম নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ম্যাডোনা-৪৩’ এর মোড়ক উন্মোচন করবেন উদীচীর সভাপতি কামাল লোহানী। উদীচী’র কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র ও চারুকলা বিভাগের প্রযোজনায় নির্মিত ‘ম্যাডোনা-৪৩’ প্রামাণ্যচিত্রটি গ্রন্থনা ও পরিচালনা করেছেন উদীচী কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য প্রদীপ ঘোষ।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্ম ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর বৃহত্তর ময়মনসিংহের কেন্দুয়ায়। বাবা তমিজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন পুলিশের দারোগা। মা জয়নাবুন্নেছা গৃহিণী। নয় ভাইবোনের মধ্যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন সবার বড়। পরিবারেই তার পড়াশোনায় হাতেখড়ি। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকা পছন্দ করতেন। পাখির বাসা, পাখি, মাছ, গরু-ছাগল, ফুল-ফলসহ আরও কত কি এঁকে মা-বাবাকে দেখাতেন। ছেলেবেলা থেকেই শিল্পকলার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। মাত্র ষোল বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিলেন কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখার জন্য। কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখে আসার পর সাধারণ পড়াশোনায় জয়নুল আবেদিনের মন বসছিল না। তাই ১৯৩৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই স্কুলের পড়ালেখা বাদ দিয়ে কলকাতায় চলে যান এবং মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস-এ ভর্তি হন। ছেলে জয়নুল আবেদিনের আগ্রহ দেখে নিজের গলার হার বিক্রি করে ছেলেকে কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি করান। পরবর্তীতে ছেলে জয়নুল আবেদিনও মায়ের সেই ভালবাসার ঋণ শোধ করেছেন দেশের স্বনামধন্য শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। জয়নুল আবেদিন ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে পড়েন। ১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৪৩ সালে ‘ম্যাডোনা’সহ দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার জন্য সারা বিশ্বের কাছে খ্যাতি অর্জন করেন জয়নুল আবেদিন। পরবর্তীসময়ে ১৯৫৭ সালে নৌকা, ১৯৫৯ সালে সংগ্রাম, ১৯৬৯ সালে নবান্ন, ১৯৭০ সালে ‘মনপুরা-৭০, ১৯৭১ সালে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’, ইত্যাদি ছবিগুলো এঁকে শিল্পের সর্বোচ্চ শিখরে নিজেকে উন্নীত করেন। এছাড়া ‘সাঁওতাল রমণী’, ‘ঝড়’ ইত্যাদি ছবিগুলোও অন্যশিল্পীদের চেয়ে তাকে আলাদা করে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালে পুরান ঢাকার জনসন রোডের ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলের একটি জীর্ণ বাড়িতে মাত্র ১৮ জন ছাত্র নিয়ে গভর্নমেন্ট আর্ট ইন্সটিটিউট এর যাত্রা শুরু হয়। শিল্পাচার্য ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানেরে উদ্যোক্তা ও প্রথম শিক্ষক। ১৯৫১ সালে এটি সেগুনবাগিচার একটি বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৬ সালে গভর্নমেন্ট আর্ট ইন্সটিটিউটকে শাহবাগে স্থানান্তর করার পর ১৯৬৩ সালে এটি একটি প্রথম শ্রেণীর সরকারী কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তখন এর নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়। স্বাধীনতার পর এটি বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় নামে পরিচিতি পায়। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ১৯৪৯-১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালের ১লা সেপ্টেম্বর এই কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প জাদুঘর ও ময়মনসিংহে গড়ে তোলেন জয়নুল সংগ্রহশালা। ১৯৭৬ সালের ২৮মে পরলোকে পাড়ি জমান বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রশিল্পের এই পথিকৃৎ।

ঢাকা, ২৯ ডিসেম্বর (ওমেনঅাই)/এসএল/

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close