আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
উদ্যোক্তা

এবার নির্মাণ কাজে নারীদের প্রশিক্ষণ

bmet wmnওমেনআই:নুরুন্নাহার। বয়স এখনও পঁচিশের কোঠায়। সংসারে স্বামী ও দুই ছেলে। গ্রামের বাড়ি ভোলায়। কাজের তাগিদে ঢাকায় থাকেন। স্বামী নির্মাণ শ্রমিক। নুরুন্নাহারও একই পেশায়। দিন শেষে কাজ অনুযায়ী ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। এই কাজের জন্য কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নিতে হয়নি তাকে। এখন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন নিজের কর্মদক্ষতা বাড়াতে। টাইলস কাটিং অ্যান্ড ফিটিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তাকে। প্রশিক্ষণ শেষে এই কাজ করলে দিনে তার আয় হবে ৫০০ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত।

‘আগে যেই কাজ করতাম হেইডা অনেক কষ্টের। খোয়া ভাঙতাম, সিমেন্ট-বালু মিশানো লাগতো, মাথায় ইটা তোলা লাগতো। অনেক ভারী কাজ। এহন টাইলসের কাজ শিখতাছি। এইডা শিখতে পারলে আর বেশি কষ্ট করণ লাগবো না। ট্যাহাও বেশি পামু।’ বলছিলেন নুরুন্নাহার।

প্রথম ধাপে তার মতো এ রকম ১৮০ জন অসচ্ছল, দরিদ্র ও নির্মাণ কাজের সঙ্গে জড়িত নারীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বাংলাদেশ-জার্মান টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অধীনস্থ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। এই প্রথম সরকারি উদ্যোগে নারী নির্মাণ শ্রমিকদের সাতদিনের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে মোট পাঁচ শ নারী শ্রমিককে এ ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ কাজের সহযোগী হিসেবে আছে বেসরকারি সংস্থা প্রিপ ট্রাস্ট।

বিএমইটির মহাপরিচালক বেগম শামছুন্নাহার মনে করেন, নারীদের এ ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তাদের কর্মদক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি সচেতনতাও বাড়বে। তিনি এই সময়কে বলেন, ‘নির্মাণ কাজে অনেক নারী শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু তাদের কোনো প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা না থাকায় পারিশ্রমিক কম। মিস্ত্রির সহযোগী হিসেবেই তারা কাজ করে যাচ্ছেন। অথচ তারাও যে মিস্ত্রি হতে পারে এই চিন্তা কেউ করেনি। এই শ্রমিকদের দক্ষ করে তুলতেই প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দক্ষ জনশক্তি দেশের সম্পদ। দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি তারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন। তাই আমরা দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ-জার্মান টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে চোখে পড়েছে প্রশিক্ষণে ব্যস্ত নারীদের। দুই-তিনটি দলে ভাগ হয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তারা। শুরুতেই দেখা গেল একটি দল ইলেকট্রিক কাটিং মেশিন দিয়ে টাইলস কাটছে। একের পর এক প্রশিক্ষণার্থী নিজ হাতে এই কাজ করছেন। দলটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন প্রশিক্ষক মোবারক হোসেন। তিনি এই ট্রেনিং সেন্টারের সিভিল ট্রেডের একজন প্রশিক্ষক। কী শেখাচ্ছেন প্রশিক্ষণার্থীদের? জবাবে তিনি বলেন, ‘শুরুতেই এই মেয়েদের মাপজোখের কাজ শেখানো হয়েছে। এখন নিজেরাই প্রয়োজনীয় মাপ দিয়ে টাইলসে দাগ দেবে। সেই দাগ অনুযায়ী মেশিন দিয়ে টাইলস কাটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কারো দুর্বলতা থাকলে একাধিকবার হাতে কলমে শেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে তাদের।’

একটু এগোতেই আরেকটি দল মাটিতে বালু বিছিয়ে ‘ওয়াটার লেভেল’ যন্ত্র দিয়ে তা সমান করছে। তার ওপরেই বসানো হবে টাইলস। এখানে কথা হয় এক প্রশিক্ষণার্থীর সঙ্গে। তিনি জানান, আগে তিনি যেখানে নির্মাণ কাজ করতেন সেখানে টাইলসের কাজ কিছুটা দেখেছেন। কিন্তু সেখার সুযোগ পাননি। তার আগ্রহ ছিল কাজ শেখার। তার বিশ্বাস এই কাজ শেখার পর তিনি কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারবেন।

জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষকদের একজন অলক কুমার। তিনি জানান, শুধু টাইলস নয়, এ রকম মোট পাঁচটি বিষয়ে নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তারা। এগুলো হচ্ছে-ম্যাসোনারি (রাজমিস্ত্রি), টাইলস কাটিং অ্যান্ড ফিটিং, প্লাস্টারিং (দেওয়ালে আস্তর দেওয়া), রড বাইডিং অ্যান্ড সাটারিং এবং পেইন্টিং (রঙের কাজ)। আগ্রহ বুঝে প্রশিক্ষণার্থীদের এসব ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। একজন প্রশিক্ষণার্থী যেকোনো এক ধরনের কাজের ওপর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সকাল এবং বিকালে দুটি আলাদা সময়ে ১৮০ নারীকে প্রাথমিকভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ছয়জন প্রশিক্ষক।

কথা হয় বাংলাদেশ-জার্মান ট্রেনিং সেন্টারের অধ্যক্ষ মো. সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একজন প্রশিক্ষিত কর্মী নিঃসন্দেহে অন্য যেকোনো শ্রমিকের তুলনায় ভালো কাজ করবে। দক্ষ হাতে উৎপাদনও ভালো হবে। কাজের গুণগত মানও ঠিক থাকবে। আয় বাড়বে। এতে দেশের পাশাপাশি ব্যক্তি নিজেও উপকৃত হবেন।’ তিনি বলেন, ‘সমাজের সুবিধা বঞ্চিত নারীদের প্রশিক্ষণ দিতে পেরে আমাদের খুব ভালো লাগছে। আগে কখনো সরকারিভাবে নারী নির্মাণ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। বেসরকারিভাবে দেওয়া হয়েছে কি না তা জানা নেই।’

প্রতিষ্ঠানটির উপাধ্যক্ষ কাজী বরকতুল ইসলাম বলেন, ‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় পুরুষ ও নারী নির্মাণ শ্রমিকের শ্রমঘণ্টা সমান হলেও পারিশ্রমিকের বেলায় নারীরা কম পান। ‘তুমি নারী’Ñএ কথা বলে তাকে ঠকানো হয়। তার ন্যায্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়। প্রতিবাদ করার সাহসও থাকে না খেটে খাওয়া নারীদের।’ তিনি বলেন, ‘এখানে নারী শ্রমিকদের শুধু যে কাজের দক্ষতার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তা নয়, পাশাপাশি ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়া এবং সেটি আদায়ের ব্যাপারেও সচেতন করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে কোথাও কাজ করলে সঠিক পারিশ্রমিক আদায়ে সক্ষম হয়, সেভাবেই গড়ে তোলা হচ্ছে তাদের।’

চল্লিশোর্ধ্ব রোকেয়ার গ্রামের বাড়ি বরিশালে। ঢাকায় থাকেন অনেকদিন হলো। নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন পাঁচ বছরের বেশি। তিনিও প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন রাজমিস্ত্রির কাজের। বললেন, ‘স্বামী অসুস্থ। শ্বাসকষ্ট। একদিন রিকশা চালাইলে তিনদিন বইয়্যা থাহে। আমি কাম না করলে খামু কী?’ নির্মাণ কাজে খোয়া ভাঙার যে কাজ তিনি করেন তাতে দিনে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ছেলে-মেয়েসহ পাঁচ জনের সংসার। এই টাকা দিয়ে চলা দায়। তাই কাজ শিখতে এসেছেন। শুনেছেন কাজ শিখলে মিস্ত্রি হতে পারবেন। আয়ও বেশি হবে। খোয়া আর ভাঙতে হবে না।

জানতে চাইলে বেসরকারি সংস্থা প্রিপ ট্রাস্টের প্রোগ্রাম অরগানাইজার মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘প্রশিক্ষণ নিতে আসা নারীদের সবাই রাজধানীর মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বস্তিতে থাকেন। প্রাথমিক জরিপ শেষে তাদের প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত করা হয়।’ তিনি জানান, প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক নারীকে সনদ ও নগদ পাঁচ হাজার ২০০ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে।-সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে।

ঢাকা, ১৪ জানুয়ারি (ওমেনঅাই)/এসএল/

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close